১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৬ রবিউস-সানি ১৪৪২
শিরোনাম :

মাছের দাম না পাওয়াতে সংকটে মৎস্য চাষিরা

Published at নভেম্বর ২১, ২০২০

মো. খোরশেদ আলম ‍জুয়েল: ”এই কষ্টের কথা কাকে জানাবো ভাই, বোঝাইতে পারিনা। টাকার সংকটে মাছকে খেতে দিতে পারছি না। আবার এত কম দামে মাছও বিক্রি করতে পারছি না। খুবই কষ্টে আছি।”মাছের বাজার দর নিয়ে এমনই হতাশার কথা বলছিলেন যশোরের মৎস্য চাষি মো. রিয়াজুল ইসলাম।

ময়মনসিংহের ফুলপুরের মৎস্য চাষি রিফাত আহমেদ জানালেন একই কথা, ‘ভাই আমি ১৯৮৪ সন থেকে মাছ চাষের সাথে জড়িত। মাছ চাষে উৎপাদন খরচ ও মাছের দামের এতটা তারতম্যের শিকার বিগত ৩৬ বছরেও মুখোমুখি হইনি।

দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রায় সব মাছ চাষিদের বর্তমান অবস্থা রিয়াজুল ইসলাম ও রিফাত আহমেদের মতোই। বেশিরভাগ চাষির ক্ষেত্রেই মাছ বিক্রি করে লাভতো দূরে থাক, মূলধন উঠানোটাই এখন কস্টকর হয়ে গেছে। এগ্রিনিউজ২৪.কম এর পক্ষ থেকে মাছ চাষিদের কাছ থেকে বিগত ২০১৯ সন এবং চলতি ২০২০ সনে নভেম্বর মাসের মাছের পাইকারি দামের খোঁজ নিয়ে উঠে এসেছে হতাশাজনক চিত্র। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় পাইকারি বাজারে গুলসা টেংরা, পাবদা, শিং, দেশি মাগুর মাছের দাম অন্তত ৩০-৫০ শতাংশ কমে গেছে। তেলাপিয়া, পাংগাস ও কার্পজাতীয় মাছের দাম কমেছে ২২-৩৭  শতাংশ পর্যন্ত। অথচ ফিড ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন খরচ বেড়েছে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০-১৫ শতাংশ। উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের ব্যাপক ফারাকের কারণে মাছ চাষে মূলধন হারাচ্ছে চাষি। এমনকি অনেক চাষি মাছের দাম কমে যাওয়ায় ঋণের টাকা দিতে না পেরে পৈত্রিক জমি ও ভিটামাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে মাছ চাষ যেন এখন চাষিদের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। অন্যদিকে মুক্ত ও আবদ্ধ জলে মাছের উৎপাদন বেড়েই চলেছে।

গত ৮ জুন প্রকাশিত হয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক প্রতিবেদন দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার–২০২০।  প্রতিবেদনটি বলছে, গত বছর বিশ্বে প্রায় ১৮ কোটি টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি অভ্যন্তরীণ উৎসের তথা স্বাদুপানির মাছ। বাকিটা সামুদ্রিক মাছ। স্বাদুপানির মাছে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থানটি আগের মতোই ধরে রেখে উৎপাদন বাড়ানোর হারে উন্নতি করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। চাষের মাছে দেশ গত ছয় বছরের মতোই পঞ্চম হয়েছে।

মাছের উৎপাদনে এতসব সাফল্য শুনতে ভালো লাগলেও মাছের দাম না পাওয়াতে চাষিদের জন্য সেটি এখন কস্টের কারণ। চাষিো এজন্য অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামঞ্জস্যহীন উৎপাদনকে দুষছেন। মাছের বাজারজাতকরণ পদ্ধতি ও বাজার সম্প্রসারন নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকাকে দায়ী করছেন অনেকেই তারা।

মাছের সর্বশেষ পাইকারি বাজার দর যাচাই করে দেখা গেছে -বর্তমানে যে শিং মাছ (৩০ পিসে কেজি) পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, গত বছরের একই সময়ে সেটি বিক্রি হয়েছে প্রায় ২৫০ টাকা কেজি; পাবদা মাছ (৩৫ পিসে কেজি) বর্তমানে যেটি ২১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে গত বছরের একই সময় সেটি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩০০ টাকা কেজি; গুলসা মাছের (৬০ পিসে কেজি) বর্তমান পাইকারি বাজার দর ৩৫০ টাকা কেজি, গত বছরের একই সময় সেটির দর ছিল প্রায় ৫০০ টাকা কেজি; দেশি মাগুর মাছ (৫-৬ পিসে কেজি) বর্তমানে দর ১৭৫ টাকা কেজি গত বছরের একই সময়ে সেটির দাম ছিল প্রায় ৩৫০ টাকা কেজি;  দেড় থেকে ২ কেজি সাইজের যেই সিলভার কার্প মাছের বর্তমান পাইকারি বাজার দর ৭৫ টাকা কেজি, সেটির দাম ছিল প্রায় ১২০ টাকা কেজি; দেড় থেকে ২ কেজি সাইজের রুই মাছের বর্তমান পাইকারি বাজার দর ১৩০ টাকা, গত বছরের একই সময় সেটি বিক্রি হয়েছে প্রায় ১৮০ টাকা কেজি; দেড় থেকে ২ কেজি সাইজের কাতলা মাছের বর্তমান পাইকারি বাজার দর যেখানে ১৬০ টাকা কেজি, গত বছর একই সাইজের সেই কাতলা মাছ বিক্রি হয়েছে প্রায় ২২০ টাকা কেজি; দেড় থেকে ২ কেজি সাইজের পাংগাস মাছের বর্তমান পাইকারি বাজার দর ৭০ টাকা কেজি, গত বছর একই সময় সেটির দাম ছিল প্রায় ৯০ টাকা কেজি; ৪ পিসে কেজি এমন সাইজের তেলাপিয়া মাছের বর্তমান পাইকারি বাজার দর ৭০ টাকা কেজি, গত বছর একই সময় সেটির দাম ছিল প্রায় ৯০ টাকা কেজি।

বাংলাদেশ অ্যাকোয়া প্রোডাক্টস কোম্পানিজ এসোসিয়েশন (বাপকা) এবং ফিসটেক হ্যাচারি লিমিটেড -এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ তারেক সরকার এ সম্পর্কে এগ্রিনিউজ২৪.কম কে বলেন, বিগত এক দশকে মাছের উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে এতটা পার্থক্য আমার চোখে পড়েনি। সম্প্রতি কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে ফিডের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে বেড়েছে মাছের উৎপাদন খরচ। অন্যদিকে পাইকারি পর্যায়ে মাছের দাম উল্টো কমছে। মাছ চাষিদের এখন কুল রাখি, না শ্যাম রাখি অবস্থা। ফিড তৈরির কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ফিডমিলার খরচ কমাতে ফিডের গুণগত মান অক্ষুন্ন রাখতে পারবেন না, তাই মাছ চাষিরা ভবিষ্যতে আরো একটি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন, এমন আশংকা প্রকাশ করেন এ সময় তারেক সরকার।

মোহাম্মদ তারেক সরকার বলেন, মাছ চাষে আমরা বিশ্বে কততম স্থান করেছি সেটির চেয়ে আমরা মাছের বাজারকে কতটা সম্প্রসারিত ও টেকসই করতে পেরেছি সেটি গুরুত্বপূর্ণ। মাছের বাজার ব্যবস্থাপনা টেকসই না করে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা ঠিক হবে না। আমাদের এখন রপ্তানির দিকে খুব সিরিয়াসভাবে নজর দিতে হবে। পরিতাপের বিষয় হলো, যেখানে আমরা মাছ রপ্তানি করতে সক্ষম সেখানে আমাদের দেশে এখনো মাছ আমদানি হচ্ছে। অবিলম্বে এটি বন্ধ করা দরকার। শুধুমাত্র স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানির জন্য আরো জোর এবং কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকার এগ্রো ফিশারিজ এর স্বত্বাধিকারী এবং বাংলাদেশ ফিস ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন -এর সিনিয়র সহ সভাপতি এ কে এম সালাহ উদ্দিন সরকার এগ্রিনিউজ২৪.কম কে বলেন, বিগত এক বছরের ব্যবধানে রেডি ফিস ফিডের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি প্রায় ৩ – ৬ টাকা, বেড়েছে খৈল, রাইস পলিশসহ খাদ্য তৈরির অন্যান্য উপকরণ সহ পুকুরে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের দামও। এর পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরী এবং পুকুরের লীজ ভ্যালুর খরচও বেড়েছে। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ১০-১৫%, কিন্তু এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাছের দাম বাড়েনি।

তিনি জানান, বিগত বছরগুলোতে প্রতি একর পুকুর থেকে খরচ বাদে তার আয় হতো ৩ থেকে ৭ লাখ টাকা। কিন্তু গত এক বছরে মাছের খাবার, ওষুধ, লবণ, চুনসহ মাছ চাষের প্রয়োজনীয় সব উপকরণের দাম বাড়লেও মাছের বিক্রয়মূল্য উল্টো ২০ – ৫০ শতাংশ কমে যাওয়াতে লাভ তো দূরে থাক, উল্টো লোকসান গুণতে হচ্ছে। দেশিয় মাছ চাষিদের যখন এই দূরাবস্থা চলছে, তখনও আমদানি হচ্ছে মাছ ও মাংস, যা আমাদের স্থানীয় বাজারকে আরো বেশি অস্থির করে তুলছে।

সালাহ উদ্দিন সরকার আক্ষেপের সুরে বলেন, সবচেয়ে অবাক হতে হয় মাছ চাষ কৃষির অংশ হওয়া সত্ত্বেও এর বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় বাণিজ্যিক বিল হিসেবে। বর্তমানে বাজারে মাছের সরবরাহ বাড়ার অন্যতম একটি কারণ- আধুনিক এবং বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ দেশে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে খরচের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে বিদ্যুৎ বিল। দুঃখের বিষয় হচ্ছে- মাছ চাষিদের দীর্ঘ দিনের দাবী “মাছ চাষের বিদ্যুৎ বিল, কৃষি বিলের আওতায় নিন” অদৃশ্য কারণে এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের প্রতি শিক্ষিত যুবকদের ব্যাপক আগ্রহ ও বিনিয়োগ লক্ষ করা গেছে। এটিকে উৎসাহিত বিদ্যুৎ বিল অবশ্যই কৃষির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে মাছের উৎপাদন খরচ যেমন কমবে, তেমনি প্রচলিত সনাতন পদ্ধতিতে পুকুরে মাছ চাষ কমবে। সনাতন পদ্ধতিতে পুকুরে মাছ চাষ কমে গেলে, কৃষি জমি রক্ষা পাবে। ফলে ফসলী জমির আওতা বাড়বে যা খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মাছের বর্তমান বাজার সম্পর্কে দেশে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য কোন নীতিমালা না থাকাকে দায়ী করেছেন বেশিরভঅগ মাছ চাষি। উদাহরণস্বরুপ তারা জানান- বর্তমানে সাধারণ ভোক্তাকে খুচরা পর্যায়ে এক কেজি তেলাপিয়া ক্রয় করতে হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি, অথচ চাষি পর্যায়ে সেই মাছের পাইকারি মূল্য মাত্র ৭০ টাকা কেজি। যেখানে ১ কেজি তেলাপিয়া (৪ পিসে কেজি) মাছের উৎপাদন করতে চাষির খরচ পড়ে প্রায় ৭৫ টাকা, সেখানে পাঁচ মাস চাষ করার পর সেটিকে কেজিতে ৫ টাকা লোকসানে মাছ বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে প্রতি কেজিতে ৫০ টাকা লাভ করছে। শুধু তাই নয়, মাছ চাষিদের নিকট থেকে যখন পাইকাররা মাছ বুঝে নেয় তখন ৪২ কেজিতে ১ মণ মাছের ওজন ধরা হয়। অর্থাৎ ওজনের ক্ষেত্রেও চাষিকে প্রতি মণে ২ কেজি লোকসান করে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হয়।

অভিজ্ঞ মৎস্য চাষি ও বিশেষজ্ঞদের মতে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে যা করতে হবে-

১. মাছ চাষে বিদ্যুৎ বিল কৃষি বিলের আওতায় নিয়ে আসতে হবে অথবা মাছ চাষের জন্য আলাদা বিদ্যুৎ মিটার থাকতে হবে। এতে করে কম জমিতে অধিক উৎপাদন হবে, শ্রমিক খরচ বাঁচবে এবং উৎপাদন খরচ কমবে।

২. যেকোনো মূল্যে মাছ ও মাংস আমদানি বন্ধ করতে হবে।

৩. মধ্যস্বত্বভোগী ও পরিবহন চাঁদাবাজদের দৌড়াত্ব কমিয়ে চাষিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে।

৪. বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মাছ রপ্তানি বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও তৎপরতা বাড়াতে হবে।

৫. রপ্তানি উপযোগী খামার নিবন্ধন এবং যথাযথ খামার ব্যবস্থাপনা মনিটরিং –এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. মাছ থেকে FPP (Further Process Product) শিল্পকে উৎসাহিত তথা স্থাপন করতে হবে। যাতে মাছ থেকে প্রসেসকৃত ফিস বল, নাগেট, পিজ্জা, কাটলেট, ফিংগার সহ এই জাতীয় Further Process Product এর মাধ্যমে আমাদের দেশিয় ও রপ্তানি তথা বাহ্যিক বাজার সম্পসারন করা যেতে পারে।

৮. মৎস্যপণ্য আমদানিতে জটিলতা দূর করতে হবে।

This post has already been read 2202 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN