১১ মাঘ ১৪২৭, ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২ জমাদিউস-সানি ১৪৪২
শিরোনাম :

বোরো ধানের জাত নির্বাচনে সতর্কতা ও করণীয়

Published at ডিসেম্বর ১৮, ২০২০

ড. মো.শাহজাহান কবীর : বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমি ৩০টি বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে বিভক্ত। ধান এমন একটা ফসল যা দেশের প্রায় সকল পরিবেশ অঞ্চলে চাষাবাদ করা গেলেও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভেদে এর অভিযোজনশীলতায় কিছুটা তারতম্য রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা অনেক সময় এলাকা ভিত্তিতে সঠিক জাত নির্ধারণ করতে পারেন না। যেমন- কোন জমিতে ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন জাত ভাল হবে কিন্তু না জানার কারণে সেখানে কৃষকরা ১৫০ দিনের বেশি জীবনকাল সম্পন্ন জাত নির্বাচন করেন। বোরো ধানের দীর্ঘ মেয়াদি (>১৫০ দিন) জাতসমূহ হচ্ছে – ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২। স্বল্প মোয়াদি (<১৫০ দিন) জাতের মধ্যে রয়েছে – ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৫। প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাতগুলো হচ্ছে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৮১ এবং উচ্চ মাত্রার জিংক (>২৪ পিপিএম) সমৃদ্ধ জাতসমূহ হচ্ছে- ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪। নিম্নোক্ত তালিকা অনুযায়ী কৃষি ইকোসিস্টেম ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে।

অঞ্চল উপযোগী জাত সমূহ   সীমাবদ্ধতা
হাওর (বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ)  অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির জন্য ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৮৯ এবং ব্রি ধান৯২
 মাঝারি নিম্ন জমিতে ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টি।
 পাহাড়ী ঢলে আগাম বন্যা।
 স্বল্পমেয়াদী, ঠান্ডা সহনশীল উচ্চ ফলনশীল জাতের অভাব।
বৃহত্তর রাজশাহী  চলনবিল ও অন্যান্য অঞ্চল : বিআর১৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 বরেন্দ্র অঞ্চল: বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 ব্রাউশ হিসেবে : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৮ ও ব্রি ধান৫৮
 ঠান্ডায় ধানের চারা উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধান লাগানোর পরে পুনরায় রোপণ করতে হয়।
 মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টির ফলে চলনবিলের নিম্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়ে দীর্ঘ জীবনকালের বোরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়
বৃহত্তর রংপুর  অপেক্ষাকৃত নিম্ন অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪,ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 অপেক্ষাকৃত উচু ও বেলে দোঁয়াশ অঞ্চলে ব্রাউশ হিসেবে: ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৫৮
 ঠান্ডা সহনশীল জাত: ব্রি ধান৩৬, ব্রি ধান৫৫ ও ব্রি ধান৬৯
 শীতে চারা মারা যায়।
 ধানের প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডার কারণে চিটা হয়ে যায়।
 ব্রাউশ ধান জুন মাসের উচ্চ তাপমাত্রার কারণে চিটা হয়।
 মাটির বুনট বেলে দোআঁশ হওয়ায় সেচ সংখ্যা অনেক বেশি লাগে। যা ধানের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া  জাত সমূহ : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫  মানসম্পন্ন ও লাগসই বীজের প্রাপ্যতা।
বৃহত্তর যশোর  জলাবদ্ধ অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 অন্যান্য অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 জলাবদ্ধতা ও বাদামী গাছ ফড়িং পোকার আক্রমণ ও ব্লাস্ট রোগ সহনশীল স্বল্প জীবনকালের জাত দরকার।
বৃহত্তর খুলনা  অলবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 মৃদু লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান১০, ব্রি ধান৯৯
 মাঝারি মাত্রায় লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান১০, ব্রি ধান৯৯
 পিট বেসিন এর আওতায় নিম্ন অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
সঠিক জাত, কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা ও ১৫ই নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় চারা উৎপাদন ও ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে রোপণ সম্পন্ন করতে পারলে ফাল্গুন-চৈত্র মাসের সর্বোচ্চ লবণাক্ততা এড়িয়ে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
বৃহত্তর বরিশাল ও পটুয়াখালী  অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা কবলিত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 মৃদু লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান১০, ব্রি ধান৯৭
 মাঝারি মাত্রায় লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান৮,বিনা ধান১০, ব্রি ধান৯৭
 অলবণাক্ত অঞ্চলে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে অর্থাৎ ধানের পরিপক্ক পর্যায়ে উচ্চ জোয়ারের কারণে অনেক বোরো ধান নষ্ট হয়।
 উচু এলাকায় ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রোপণ কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
বৃহত্তর ঢাকা   ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫  শিল্প বর্জ্য বোরো ধান উৎপাদনে ব্যাপক ভাবে ব্যাহত করেছে। সেচের পানিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতু মিশ্রিত।
বৃহত্তর ফরিদপুর  জোয়ার-ভাটা কবলিত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 উঁচু অঞ্চল : ব্রি ধান২৮,ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬
 পিট বেসিন এর আওতায় নিম্ন অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫
বৃহত্তর চট্রগ্রাম   পাহাড়ি ভ্যালি অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৭,ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 অলবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫
 লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান৮, বিনা ধান১০, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯
বৃহত্তর ময়মনসিংহ  অপেক্ষাকৃত নিম্ন অঞ্চল (হাওর) : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫
 অপেক্ষাকৃত মধ্য উঁচু অঞ্চল : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫
 মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টি।
 পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যা।
কুমিল্লা  ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫  জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় বোরো চাষে দেরি হয়। ফলে বোরো ধান কাটার সময় হঠাৎ বৃষ্টি হলে পাকা বোরো ধান অনেক ক্ষেত্রে তলিয়ে যায়।
বৃহত্তর সিলেট  হাওর অঞ্চলের বাহিরে (মধ্য উঁচু জমিতে): ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫  মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টি।
 পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যা।

লেখক: মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট।

This post has already been read 1652 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN