২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৫ জুন ২০২০, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১
শিরোনাম :

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ চাষ

Published at ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২০

প্রতিকী ছবি

সালাহ উদ্দিন সরকার তপন : আজকের পর্বে আলোচনা করবো মাছ ও চিংড়ী কেন আমরা বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চাষ করব, বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চাষ করতে কি কি লাগে এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোর সাথে পরিচিতি ও আলোচনা। বায়োফ্লক হলো প্রোটিন সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ এবং অণুজীব, ফ্লক পানিতে ভাসমান বা নিমজ্জিত অবস্থায় থাকতে পারে। ফ্লকে প্রচুর প্রোটিন ও লিপিড রয়েছে,যা মাছ বা চিংড়ির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের উৎস, যেমন- ডায়াটম, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, অ্যালজি, ফেকাল পিলেট, জীবদেহের ধ্বংসাবশেষ এবং অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণি ইত্যাদির ম্যাক্রো-এগ্রিগেট।

বায়োফ্লকে মাছ চাষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা ও ফ্লক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেকোন মাছ বা চিংড়ি চাষ বা বায়োফ্লক প্রজেক্ট করার আগে পানির উৎস কি হবে এবং তার গুণাগুণ বা ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

তার আগে আসুন আমরা জেনে নেই কেন আমরা বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ ও চিংড়ি চাষ করব-

কেন বায়োফ্লক?
ইদানীং বায়োফ্লক নিয়ে যে এত মাতামাতি। এটার কারণ কি? কারন হলো-
১. বায়োফ্লক প্রযুক্তি মূলত বর্জ্য পুষ্টির পুর্নব্যবহারযোগ্য নীতি, বিশেষ করে, নাইট্রোজেন, মাইক্রোবায়াল জৈব বস্তুপুঞ্জের মধ্যে খাবারের খরচ কমাতে এবং মাছের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ‘বায়োফ্লক’ প্রযুক্তি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।

২. পানির পিএইচ ডিও সহ অন্যান্য প্যারামিটার সহজেই মনিটরিং ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

৩. বায়োফ্লকের মূল লক্ষ্য হলো- অধিক ঘনত্বে ছোট এরিয়াতে মাছ চাষ করা। এ পদ্ধতিতে স্বাভাবিক পুকুরের চাইতে প্রায় ৩০ গুণ বেশি মাছ চাষ করা যায়।
৪. সম্পূর্ণ প্রোবায়োটিক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা বিধায় বায়োফ্লক ব্যাপকভাবে অ্যামোনিয়া এবং হাইড্রোজেন সালফাইড মাত্রা হ্রাস করে।

৫. প্রোটিন ও লিপিড যুক্ত ফ্লক মাছ বা চিংড়ি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে ফলে অপেক্ষকৃত ভালো FCR পাওয়া যায়। প্রজাতিভেদে প্রায় ১০-৩০% উন্নত FCR পাওয়া যায় বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে।
৬. পানিতে হ্যাটারটপিক ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতির কারণে পানিতে ময়লা আবর্জনা গঠন হওয়া প্রতিরোধ করা যায়।
৭. অতিরিক্ত খাবার সহ সব ধরনের জৈব বর্জ্য জারিত করার মাধ্যমে ধ্বংস করে ফ্লক (প্রোবায়োটিক কলোনি) তৈরি করে এবং পুকুরটি পরিষ্কার রাখে।

৮. বায়োফ্লকের জলজ পরিবেশ উন্নত রাখতে বন্ধুর মত কাজ করে।

৯. ফ্লকে উপকারি ব্যাকটেরিয়া তাদের কলোনি সৃষ্টি করে যা খাদ্যের মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করে ফলে মাছ বিভিন্ন ক্ষতিকারক জীবাণু থেকে রক্ষা পায়।
১০. উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতির কারণে অপকারি ব্যাকটেরিয়াজনিক সমস্যা ও রোগ প্রতিরোধ করে।

১১. বায়োফ্লকের তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ফ্লক বিভিন্ন ট্যাংক বা পুকুরে সরাসরি খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়।

১২. প্রোবায়োটিকের নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করার ফলে ফ্লকে প্রাকৃতিক খাদ্যের যোগান বাড়ায়।
১৩. পানির রং এবং ও অন্যান্য গুণগতমান সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
১৪. সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা হাতের মুঠোয় থাকার কারনে মাছের বেঁচে থাকার হার এবং মাছের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায়।
১৫. সম্পূর্ণ প্রোবায়োটিক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা বিধায় পানিতে গন্ধজনিত সমস্যা কমায়।
১৬. কম শ্রমিকে অধিক মাছ চাষ, অর্থাৎ শ্রমিক খরচ কম।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ চাষ করতে মোটামুটি যা যা লাগবে তার একটি প্রাথমিক ধারনা ১০ টনের একটি ট্যাংকির হিসেব করে প্রাথমিক শুরু করার উপাদান গুলো দেওয়া হলো-

১. পানির ট্যাংক;
২. গুনগত মান সম্পন্ন পানি;
৩. ১০০ গ্রাম প্রোবায়োটিক (Floc Pro-1, Floc Pro-2, Booster, Bioflucan etc);
৪. ১-২ কেজি চিটাগুড় মোলাসেস;
৫. চুন Caco3: ২ কেজি ;
৬. র সল্ট ১০ কেজি;
৭. এয়ার স্টোনসহ এয়ার পাম্প বা এয়ার ব্লাওয়ার;
৮. টিডিএস মিটার;
৯. পিএইচ মিটার;
১০. ডিও মিটার;

১১. এলকালাইনিটি টেস্ট কিট
১২. অ্যামোনিয়া টেস্ট কীট;
১৩. থার্মোমিটার;

১৪. TSS (Total Suspended Solid) পরিমাপের জন্য প্রয়োজন ইমহোফ কোন.

১৫. ২০ – ২৫ লিটারের বালতি ২-৩টি।

প্রোবায়োটিক কী?
গ্রিক শব্দ ‘প্রো’ কথার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘প্রোমোটিং’যার বাংলা অর্থ উন্নয়ন করা বা বেগবান করা বা পক্ষে। ‘বায়োটিক’ কথার ইংরেজি অর্থ হলো ‘লাইফ’, যার বাংলা প্রতিশব্দ জীবন, এবার এই দুটি শব্দকে একত্র করলে দাঁড়ায় জীবনের উন্নয়ন করা বা জীবন বেগবানকারি।

আবার বলা যায় প্রোবায়োটিক মানে: জীবনের জন্য বা জীবনের পক্ষে! “প্রোবায়োটিকস হলো এমন কিছু জীবন্ত অনুজীব যা পর্যাপ্ত পরিমানে প্রয়োগের ফলে পোষক দেহের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।” আমরা ঐসমস্ত ব্যাকটেরিয়াকে প্রোবায়োটিক বলি, যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া মানুষের সুস্থ জীবন ধারনের জন্য প্রতিনিয়ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালান করে চলছে।

এখানে প্রোবায়োটিকের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করবোনা। বায়োফ্লকে যে প্রোবায়োটিক ব্যবহার করা হয় সে ব্যাপারে এক কথায় কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। বায়োফ্লকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে প্রোবায়োটিক বা ব্যাক্টেরিয়া। ব্যাক্টেরিয়া প্রধানত দুই প্রকার-

১. উপকারি ব্যাক্টেরিয়া বা প্রোবায়োটিক,

২. অপকারি বা ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া, যেমন ল্যাকটোব্যাসেলিয়াস নাম ব্যাকটেরিয়া। এটা দিয়ে দুধ থেকে দই তৈরি হয়। এছাড়া আমাদের পাকস্থলীতে অনেক ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে যার সংখ্যা প্রায় ৪০০ হবে। যা আমাদের হজম কাজে সাহায্য করে। বায়োফ্লকে ব্যবহৃত প্রোবায়োটিক মাছের উচ্ছিস্ট থেকে তৈরি অ্যামোনিয়া গ্যাস দূরীভূত করে ফ্লক বা প্রোটিন সেল তৈরি করে।

চিটাগুড়/মোলাসেস কি?

মোলাসেস হলো চিটাগুড় বা গুড়ও বলা যায়। আবার অঞ্চলভেদে ঝোলাগুড়, লালি, রাব সহ বিভিন্ন নামেও ডাকা হয়। এটা হলো কার্বনের উৎস, তাই বলে কয়লা নেয়া যাবে না। কারণ, কয়লার কার্বন অণুজীব গ্রহণ করতে পারবেনা। যদি চিটাগুড়/মোনাসেস না পেলে গুড় বা চিনি বা লাল চিনি ব্যবহার করা যাবে।

ডিও মিটার কি?

এটা দিয়ে পানির ডিজল্ভ অক্সিজেন পরিমাপ করা হয়। পানিতে ৫-৮ মি.গ্রা/লিটার হারে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকলে মাছ কাঙ্ক্ষিত হারে বৃদ্ধি পায়। পানিতে ২.০ মি.গ্রা/লিটারের কম অক্সিজেন থাকলে রুইজাতীয় মাছ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না। অবশ্য মাছ ভেদে অক্সিজেনের মাত্রা পৃথক হতে পারে।

সল্ট কি?

মানে খোলা লবন, যেই লবন আমরা সাধারণত গরুকে খাইয়ে থাকি, এই লবন অপরিশোধিত সামদ্রিক লবন, যেটাতে কোন আয়োডিন থাকে না।

পিএইচ মিটার কি?

এটা দিয়ে পানির পিএইচ পরিমাপ করা হয়। মাছ চাষের পানিতে পিএইচ এর মাত্রা ৭-৮.৫ এর মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। পিএইচ মাত্রা যদি ৪.৫ এর নিচে হয় এবং ১০ এর উপরে হয় তবে সব মাছ মারা পড়বে। পিএইচ যদি ৬.৫-৮.৫ এর নিচে বা উপরে হয় তবে এক্ষেত্রে মাছ যেকোনভাবে আক্রান্ত হবে।

টিডিএস মিটার কি?

TDS এর পূর্ণরূপ Total Dissolved Solid. পানিতে সাধারণত দ্রবীভূত অবস্থায় ক্যালসিয়াম , ম্যাগনেসিয়াম , পটাসিয়াম ও সোডিয়ামসহ আরো কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদান থাকে যাকে টিডিএস (TDS) বলা হয় এবং এগুলো পরিমাপের যন্ত্রটিই হল টিডিএস মিটার। প্রজাতিভেদে মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত টিডিএস হল ৩০০-২০০০মিগ্রা/লিটার এর মধ্যে।

অ্যামোনিয়া টেস্ট কিট কি?

এটা একধরণের তরল পানীয় রি-এজেন্ট। এটা দিয়ে পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমান পরীক্ষা করা হয়। অ্যামোনিয়া ০.৬-২.০ মিলিগ্রাম/লিটার হলে মাছের জন্য তা বিষাক্ত হয়ে থাকে। বায়োফ্লকের জন্য অ্যামোনিয়া ঘনত্বের সর্বোচ্চ মাত্রা হলো ০.১মিলিগ্রাম/লিটার। অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ০.২ মিলিগ্রাম/লিটার এর কম থাকা ভালো, যদিও ০.৪ মিলিগ্রাম/লিটার গ্রহণযোগ্য। সাধারণত: ৫ মিলি পানির সাথে ৪ ফোটা কিট যোগ করে পরীক্ষা করতে হয়।

TSS (Total Suspended Solid)

যা দিয়ে মূলত ট্যাংকের ফ্লকের পরিমাপ করা হয়। এটা বায়োফ্লকের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, সেসপেন্ডেড সলিড এর পরিমান বেশি হয়ে গেলে, যেমন-

১. যেসব মাছ/চিংড়ি তাদের ফুলকা দিয়ে ফিল্টারিং করতে পারবে না তাদের ব্রীদিং প্রোবলেম শুরু হবে ও দূর্বল হয়ে মারা যাবে।

২. ফ্লকের পরিমান বেশি হয়ে গেলে ট্যাংকের ডিও কমে যাবে (কেননা হেট্রোট্রফিক ব্যকটেরিয়া এ্যারোবিক মানে তারাও অক্সিজেন গ্রহণ করে)। তাই ট্যাংক এর পরিবেশ চাষের উপযুক্ত রাখতে ও সকল উপাদানের মধ্যে (পিএইচ, এ্যমোনিয়া, প্রোয়গকৃত কার্বন সোর্স ) ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের কে ফ্লক এর পরিমানের উপর নজর রাখাতে হবে।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ

বায়োফ্লকের জন্য তাপমাত্রা একটা বড় ফ্যাক্টর। তাপমাত্রা ২০ এর নিচে নেমে গেলে বায়োফ্লক তৈরী হবে না। স্ট্যান্ডার্ড তাপমাত্রা হল ৩০ ডিগ্রী। তাই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, বিশেষ করে শীতকালে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্যাংকের মাটি পিভিসি শিট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। অথবা কর্কশীটও (ফোম) ব্যবহার করা যায়। আর উপরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য শেড দিতে হবে। অনেকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্যও এক ধরণের ফোম ব্যবহার করে থাকে, আবার অনেক শীতকালে তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য হিটার ব্যবহার করে থাকে, তবে বিদ্যুৎ বিলের দিকে নজর দিতে হবে, তাছাড়াও বিভিন্ন ধরণের এয়ারেশন এর সাহায্যও নেওয়া হয় শীতের দিনে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রের জন্য।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে ট্যাংকে ও পুকুরে চাষ করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্যালেনিটি। তাই ট্যাংক এ সল্ট ব্যবহারের সময় প্রজাতি ভেদে স্যালেনিটির দিকে খুব সতর্কতার সাথে অবশ্যই নজর রাখতে হবে, অনেকেই মাছি মারা কেরানীর মত আমাদের দেশের সব মাছের জন্য টিডিএস ১৮০০ ধরে বেশী পরিমানে লবণ দিয়ে থাকে, যা ঠিক নয় আমাদের দেশের ফ্রেশ ওয়াটার ফিস অধিকাংশ ৩০০-৮০০ টিডিএস হলেই যথেষ্ট, অবশ্য মাছ বড় হলে ধীরে ধীরে কিছুটা টিডিএস বাড়াতে পারেন; তেমনি স্যালেনিটির ক্ষেত্রেও খুব সতর্কতার সাথে পথ চলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিং মাগুর স্যালাইনিটি কম থাকাই ভাল, আবার তেপালিয়ার শিং মাগুর থেকে কিছুটা বেশী থাকলে সমস্যা নাই।

লেখক: ম্যানেজিং পার্টনার, সরকার এগ্রো ফিসারিজ ও বারানি বায়োটেক ফিস কালচার।

This post has already been read 4150 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN