২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৬ জুন ২০২০, ১৫ শাওয়াল ১৪৪১
শিরোনাম :

বাণিজি্যক মাছ চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার ও এয়ারেটরের ভূমিকা

Published at জানুয়ারি ১৯, ২০২০

আহসানুল আলম (জন): মৎস্য সেক্টরে প্রযুক্তির ব্যবহার এই শিল্পকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। যদিও আমাদের দেশের মৎস্য সেক্টরে প্রযুক্তির ব্যবহার খুব ধীরগতিতে চলছে কিন্তু এটা ভাবতে ভালো লাগে যে, আজকাল খামারিরা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন। এই যেমন কয়েক বছর আগেও পুকুরে এয়ারেটর (Aerator) ব্যবহার করার কথা কেউ তেমন ভাবতেন না, কিন্তু আজকাল বাণিজ্যিক মৎস্য চাষে এয়ারেটর একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই হয়ত মনে করেন এয়ারেটর এর কাজ শুধু পুকুরে অক্সিজেন সরবরাহ করা, কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে- পুকুরের পরিবেশগত সামগ্রিক উন্নতির জন্য এয়ারেটর একটা বড় ভূমিকা পালন করে। যেমন-

১. এয়ারেটর পানিতে স্রোত সৃষ্টি করে এবং পানিকে ওলটপালট করে যার ফলে পানি দ্রুত বিষাক্ত ও ক্ষতিকর গ্যাস মুক্ত হয়। এতে জলজ পরিবেশে মাছ ও চিংড়ির স্বাভাবিক বেঁচে থাকা, খাদ্যগ্রহণ ও বৃদ্ধি চলমান থাকে।

২. পানিতে দ্রুত বায়ুমন্ডলীয় অক্সিজেন মিশ্রিত করে জলাশয়ে চাষকৃত প্রজাতি ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র অণুজীবের অক্সিজেন চাহিদা মেটায় যার ফলে জলাশয়ের ইকো-সিস্টেম সক্রিয় থাকে।

৩. এয়ারেটর অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে পানির প্রাকৃতিক খাদ্যের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে। বিশেষ করে রাতে যখন সূর্যের আলো থাকে না তখন সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে। ওই সময় উদ্ভিদ কণাগুলো অক্সিজেন উৎপাদন করার পরিবর্তে উল্টো অক্সিজেন গ্রহণ করে। ফলে রাতের বেলায় জলাশয়ের অক্সিজেন কমে যায়। এতে মাছসহ সব রকমের জলজ প্রাণী অক্সিজেন সংকটে পড়ে। রাতের বেলায় বিশেষ করে শেষ রাতে পুকুরে এয়ারেটর চালালে এই সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

৪. অনেক সময় দিনে ও রাতে একটানা বৃষ্টিসহ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে। এই সময় পানিতে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দেয়। বৃষ্টি ও মেঘাচ্ছন্ন দিনে এয়ারেটর চালিয়ে পানিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে মাছ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জীব সম্প্রদায়কে সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে রক্ষা করা যায়।

৫. অক্সিজেন মাছের খাদ্য গ্রহণ ও হজমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। খাদ্য গ্রহণের সাথে সাথে মাছের অক্সিজেন গ্রহণের চাহিদা অনেক গুণে বৃদ্ধি পায়। খাদ্য প্রয়োগের পর এয়ারেটর চালিয়ে এদের অতিরিক্ত অক্সিজেনের যোগান দেওয়া যায়। খাদ্যগ্রহণের পর অতিরিক্ত অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করতে না পারলে মাছের খাদ্য হজম যেমন হবে না, তেমনি ওই খাদ্য মাছের বৃদ্ধিতে তেমন কাজে আসবে না। এইরকম সংকটে মাছ বা জলজ প্রাণীগুলোর মৃত্যু হওয়ার আশংকা বেশি থাকে।

৬. মাছের দৈহিক বৃদ্ধিতে অক্সিজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অক্সিজেন মাছের বৃদ্ধি, খাদ্যগ্রহণ ও প্রজননে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। কম অক্সিজেন যুক্ত জলাশয়ে মাছের খাদ্য চাহিদা কম থাকে। যার ফলে অতিরিক্ত খাদ্য পঁচে পানি দূষিত করে। মাছ চাষে ৫-৭ ppm হচ্ছে পানির আদর্শ অক্সিজেন মাত্রা। এই পরিমাণ অক্সিজেন ধরে রাখার জন্য পুকুরে এয়ারেটর এর বিকল্প নেই।

৭. আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত এবং উচ্চ ঘনত্বের মাছ বা চিংড়ি চাষে এয়ারেটর এর বিকল্প নেই। এয়ারেটর এর মাধ্যমে পুকুরে অক্সিজেন সরবরাহ করে প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির চেয়ে ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।

৮. এয়ারেটর দ্বারা সৃষ্ট অক্সিজেন পানিতে থাকা বিভিন্ন রোগজীবাণু প্রভাব কমাতে যেমনি ভূমিকা রাখে তেমনি মাছের জন্য বিষাক্ত অ্যামেনিয়া গ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মাছ ও চিংড়িকে রক্ষা করে।

৯. এয়ারেটর এর স্রোতের বিপরীতে মাছ বা চিংড়ি সাঁতার কাটে। ফলে মাছ বা চিংড়ির শরীরে কোন প্রকার ময়লা বা ক্ষতিকর প্রাণী বা পদার্থ লেগে থাকতে পারে না। এতে মাছের শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। এছাড়া এয়ারেটর পুকুরের তলায় জমা হওয়া জৈব পদার্থগুলোকে পুকুরের কেন্দ্রের দিকে জমা হতে সহয়তা করে। এই জমা হওয়া জৈব পদার্থগুলো পাম্পিং করে পুকুরকে দূষণ থেকে রক্ষা করা যায়।

১০. পুকুরে, চুন, সার, প্রোবায়োটিক ও বিভিন্ন ধরনের ওষুধপত্র প্রয়োগ করা হলে তা পানির সাথে দ্রুত মিশিয়ে দিতে এয়ারেটর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কোন ধরনের এয়ারেটর ভালো : এয়ারেটর পছন্দের ক্ষেত্রে আমরা কিছু পদ্ধতিগত ভুল করে থাকি। মনে রাখতে হবে এটা একটা মেকানিকাল ডিভাইস যেখানে পদার্থ বিজ্ঞানের অনেক সূত্র জড়িত আছে। আমরা অনেক সময় ঝোঁকের মাথাই সঠিক হিসাব না করে নিজেরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে

এয়ারেটর বানিয়ে ব্যবহার করছি কিন্তু আমরা কী নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, পুকুরের সামগ্রিক উন্নতির জন্য এই এয়ারেটর কতটুকু কাজ করছে? বাজারে বিভিন্ন ধরনের এয়ারেটর পাওয়া যায় যেমন প্যাডেল হুইল, ফিস পন্ড এয়ারের, টারবাইন, ডিফিউজার ইত্যাদি। এক একটা এয়ারেটর এর কাজ একেক রকম। সাধারণত প্যাডেল হুইল এয়ারেটর পুকুরের উপরের স্তরে আমরা ব্যবহার করে থাকি যেটা মোটরের শক্তি ভেদে ২ ইঞ্চি থেকে ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত পানির নিচে ডুবানো থাকে। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ rpm এর এই হুইলগুলা ঘুরে থাকে। তবে বাণিজ্যিক প্যাডেলগুলা প্রায় ৯০ rpm এর মতো ঘুরে থাকে যেখান থেকে প্রতি HP এর জন্য ঘণ্টায় ৩ কেজি পর্যন্ত অক্সিজেন তৈরি হতে পারে। এই এয়ারেটর এর একটা অসুবিধা হচ্ছে- নিচের স্তরে এটি তেমন কাজ করতে পারে না ফলে পুকুরের তলদেশের খুব বেশি পরিবর্তন এই এয়ারেটর এর মাধ্যমে আনা সম্ভব না। তবে অক্সিজেন ঘাটতি বা অন্য যেসব সমস্যার কারণে পুকুরের উপরে মাছ ভেসে ওঠে, সেই ক্ষেত্রে এই এয়ারেটর খুবই কার্যকরী ভুমিকা পালন করে থাকে। সাধারণত ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি চওড়া প্যাডেল এবং সঠিক rpm ব্যবহার করলে এর থেকে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

আরেক ধরণের এয়ারেটর আমরা ব্যবহার করে থাকি। এটি হলো সাবমারসিবল পাম্প এবং এই পাম্প সহজেই ন্যানো বাবল তৈরি করে থাকে। আমাদের দেশের পুকুরের পরিবেশগত দিক বিবেচনা করলে এই পদ্ধতি সবথেকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ এটা পুকুরের তলদেশ থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যখন উপরের স্তরে আসে তখন প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন পানিতে মেশাতে মেশাতে আসে। কাজেই দেখা যাচ্ছে অধিক অক্সিজেনের কারণে পুকুরের সমগ্র পরিবেশের উন্নতি ঘটে। সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে- ন্যানো বাবল যখন উপরের দিকে আসে তখন তার সাথে সাথে পানির কনাও চলে আসে। ফলে একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়। আর সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করার জন্য উপরের স্তরের পানি নিচে চলে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা এক গ্লাস পানিতে চিনি মিশিয়ে ভালোভাবে নাড়ালে যেমন সমগ্র পানিতে চিনি মিশে যায় ঠিক তেমন। পানির এই নড়াচড়ার ফলে পুকুরের পরিবেশ সামগ্রিকভাবে উন্নত হয়। তাছাড়া, পুকুরের তলদেশে অধিক অক্সিজেন প্রবেশের কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া তরান্বিত হয়ে পুকুরের পানিতে অক্সিজেন এবং কার্বন-ডাইঅক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষা থাকে। পরিবেশ এবং মাছের প্রজাতি ভেদে অক্সিজেন ব্যবহারের তারতম্য হয়ে থাকে। কাজেই সাধারণত ৩/৪ কেজি অক্সিজেন প্রতি HP/ঘন্টায় সরবরাহ করে এমন ধরণের মেশিন নির্বাচন করা উচিত। সাধারণত প্রতি ১ একরের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় ১ থেক ১.৫ HP এর মেশিন ব্যবহার করা উচিত। তবে চরম পর্যায়ে ২ HP পর্যন্ত করা ভাল।

এয়ারেটরের ক্ষমতা নির্ণয় : একটা ছোট সূত্র আপনারা ব্যবহার করতে পারেন। যেমন- পুকুরের দৈর্ঘ্য×প্রস্থকে ৪৩৫৬০ দিয়ে ভাগ করে যে ফলাফল পাওয়া যায় তাকে ১.৫ দিয়ে গুণ করলে আপনার কাঙ্খিত এয়ারেটর এর শক্তি আপনি পেতে পারেন। যেমন আপনার পুকুরের দৈর্ঘ্য ২০০ ফুট এবং প্রস্থ ১৫০ ফুট। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ২০০×১৫০=৩০,০০০। এ সংখ্যাকে ৪৩৫৬০ দিয়ে ভাগ করলে হবে ৩০০০০/৪৩৫৬০= ০.৬৮ । একে ১.৫ দিয়ে গুণ করলে হবে ০.৬৮ × ১.৫ = ১.০২ । মানে ১ হর্স পাওয়ারের মেশিন এই পুকুরের জন্য যথেষ্ট। এয়ারেটর নিয়ে পরবর্তীতে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা থাকলো। সবাই ভালো থাকুন।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ফিস ফার্মারস এসোসিয়েশন ও স্বত্ত্বাধিকারী, পল্লী ফুড ফার্মস।

This post has already been read 3326 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN