২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০ রবিউস-সানি ১৪৪১
শিরোনাম :

বাংলাদেশে সুগন্ধি চাষের বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও করণীয়

Published at নভেম্বর ১১, ২০১৯

মৃত্যুঞ্জয় রায় : গোটা ভারতবর্ষ একসময় বিশ্বে পরিচিত ছিল ’মসলার দেশ বা সুগন্ধি গাছের দেশ নামে। আমাদের দেশও ছিল তার ভেতর। এ উপমহাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি মসলা ও গাছপালা যেত বাইরের দেশে। ইতিহাসে মসলার জন্য যুদ্ধও কম হয়নি। প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্ব থেকেই এসব গাছের ব্যবহার ও বাণিজ্যের উল্লেখ বিভিন্ন সাহিত্যে পাওয়া যায়। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশই নয়, এশিয়া মহাদেশ জুড়ে ছিল সুগন্ধি গাছপালার প্রাচুর্য। প্রায় ২৮০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে জনৈক চীনা সম্রাট শেন নাং চীনে নিয়মিতভাবে সুগন্ধি গাছের বাজার বসাতেন আর কিনতেন নানারকম মসলাসামগ্রী। তিনি প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি মসলা খেতেন সুস্বাস্থ্যের আশায়। চীন, থাইল্যাণ্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মায়ানমার প্রভৃতি দেশজুড়ে পাওয়া যেত নানা রকমের সুগন্ধি গাছ। বলাবাহুল্য সেসব গাছের অধিকাংশই সংগৃহীত হতো বনজঙ্গল থেকে। ধীরে ধীরে মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক কারণে কিছু বিশেষ বিশেষ সুগন্ধি গাছের চাষ শুরু হয়। এখনো সে চাষাবাদ অব্যাহত আছে, কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে নানারকম সুগন্ধি গাছ আবাদ করে অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন।

সুগন্ধি গাছ আসলে কোন গাছ

এলাচ বা দারচিনির ঘ্রাণ নিলে এক ধরনের সুগন্ধ ভেসে আসে, সুগন্ধ আসে পুদিনা পাতা থেকেও। এসবই সুগন্ধি গাছ। সুগন্ধি গাছে এক ধরনের গ্রন্থি বিভিন্ন প্রকার সুগন্ধ তেলে পূর্ণ থাকে। সেসব তেলের কারণেই গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে সুগন্ধ বের হয়। এসব গাছ খাদ্যকে সুগন্ধযুক্ত ও সুস্বাদু করতে, প্রসাধন সামগ্রী, ঔষধ, বালাইনাশক ইত্যাদি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। তাই এসব গাছ থেকে সুগন্ধ তেল আহরণ করে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে আমাদের দেশে অধিকাংশ সুগন্ধি গাছই মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে প্রায় সব সুগন্ধি গাছেরই কিছু না কিছু ভেষজ গুরুত্ব আছে।

বাংলাদেশে কি কি সুগন্ধি গাছ আছে?

পৃথিবীতে প্রায় ৬০টি পরিবারের কয়েকশ সুগন্ধি গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর অধিকাংশ গাছই সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব গাছ খাদ্যে শুধু সুগন্ধই আনে না, সুস্বাদু করে, খাদ্যের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ প্রজাতির সুগন্ধি গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব গাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও সাধারণভাবে আবাদকৃত সুগন্ধিগাছগুলো হলো মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, বিলাতী ধনিয়া, মৌরি, জৈন, মেথি, কালোজিরা, রাঁধুনি, আম আদা, পুদিনা, সুগন্ধি চাল,  তেজপাতা, দারচিনি, গোলমরিচ, বাজনা ইত্যাদি। এসব গাছ এ দেশে ভালো জন্মে। আরও কিছু সুগন্ধি গাছ আছে যেগুলো এ দেশে স্বল্প আকারে হয় অথবা বনে জঙ্গলে পাওয়া যায়, যেমন কারিপাতা, পোলাও পাতা,  লেবু ঘাস, ঘাগরা ইত্যাদি। অন্য দেশ থেকে এনে আমরা খাই এলাচ, জিরা, লবঙ্গ ইত্যাদি। তবে আমাদের দেশেই বনে বাদাড়ে আরো অনেক সুগন্ধি গাছ আছে যেগুলোর খবর আমরা অনেকে রাখিনা বা চিনি না। অপাং, বচ, বেল, কুলাঞ্জন, তারা, গোবুরা, হেলেঞ্চা, আগর, চা, কর্পুর, কমলা, জাম্বুরা, বন হলুদ, গন্ধবেনা, কদবেল, বিলাতী তুলসি, বন মল্লিকা, বেলি, চন্দ্রমূলা, ভুইচাঁপা, দোলনচাঁপা, মেহেদী, দ্রোণ, গাউচি, শ্বেতদ্রোণ, গোলাপ, পান, গোলাপ জাম, পাতিজাম, গাঁদা ফুল, জোয়ান, কাশ, একাঙ্গি, চন্দন, বকুল, রজনীগন্ধা ইত্যাদি। এছাড়া তোকমা, পানবিলাস, বনহলুদ ইত্যাদি আরও এমন কিছু গাছ এদেশে রয়েছে যেগুলোকে এখনো সুগন্ধি গাছের তালিকাভূক্ত করা হয়নি। পার্বত্য অঞ্চলের অনেক সুগন্ধি গাছই তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, ঠিকমতো অনুসন্ধান চালালে সুগন্ধি গাছের সংখ্যা/প্রজাতি হয়তো ১০০ ছাড়িয়ে যাবে।

চাষাবাদের বাণিজ্য সম্ভাবনা আছে কি?

অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত দু চারটি মসলা ফসল ছাড়া আর কোন সুগন্ধি গাছ সাধারণত বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়না। কিন্তু প্রতিটি গাছেরই বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষের সুযোগ রয়েছে। প্রতি বছর এ দেশের আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ এসব গাছ তাদের ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করে থাকে। এ দেশে মোট ৫৬৩টি ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ওষুধ তৈরি করে থাকে যার অধিকাংশ কাঁচামাল এসব সুগন্ধি ও ভেষজ গাছ। ঠিকমতো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে সুগন্ধি গাছের একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি করা সম্ভব। এসব গাছের মধ্যে কিছু গাছ থেকে সুগন্ধি উদ্বায়ী তেল সংগ্রহ করে শিল্পের কাাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিছু গাছ সরাসরি বিভিন্ন বস্তুকে সুগন্ধ করতে ব্যবহৃত হয়, কিছু গাছ সরাসরি খাদ্য হিসেবে খাওয়া হয়। সুগন্ধি ফুলগাছের ফুল থেকে সুরভি দ্রব্য বা এসেন্স, প্রসাধনী দ্রব্য, রঙ, এয়ার ফ্রেশনার, জীবাণুনাশক ইত্যাদি তৈরি করা হচ্ছে। তবে শুষ্ক সুগন্ধি ফুলের এখন নতুন কদর বেড়েছে পট পৌরি তৈরিতে। একটা ছোট্ট পটে কিছু শুকনো সুগন্ধি ফুল রেখে সেসব পট ঘরকে সুগন্ধযুক্ত রাখার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে এ শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। প্রাচীন মিশরীয় ও ব্যবলনীয়রা কমলা ফুল থেকে পাতন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক পারফিউম তৈরি করে ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। এখন সেসব ধারা যন্ত্রের কাছে পড়ে অনেক বেশি আধুনিক হয়েছে। বেলি ফুল থেকে ভারতেই এখন বাণিজ্যিকভাবে সুগন্ধি তৈরি হচ্ছে। আমাদের দেশেও তা সম্ভব। ইতোমধ্যে আগর গাছ থেকে মৌলভীবাজারে বাণিজ্যিকভাবে আগর উৎপাদন করা হচ্ছে।

করণীয় কি?

আমাদের দেশে পিঁয়াজ, রসুন, আদা, ধনিয়া ইত্যাদি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় সত্য। তবে সেসব ফসল চাষের জমি যেমন কম, তেমনি ফলনও কম। উদাহরণ হিসেবে আদার কথা বলা যেতে পারে। এ দেশে আদার গড় জাতীয় ফলন হেক্টরে মাত্র ৫.৫ মেট্রিক টন, হলুদের ২.৬৬ মেট্রিক টন/হেক্টর। অথচ উন্নত জাতের আদা ও হলুদ আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া সম্ভব। এসব কারণে মসলা ও সুগন্ধি ফসলের বর্তমান উৎপাদন এ দেশের চাহিদা মিটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়। তাই প্রতি বছর বিদেশ থেকে এসব সুগন্ধি পণ্য/দ্রব্য আমদানি করতে হয়। বিদেশ থেকে এ ধরনের যা আসে সেসব পণ্যের মান ও দর্শনমূল্য অনেক বেশি। যদিও দেশী সুগন্ধি পণ্যের স্বাদ ও সুগন্ধ ওসব পণ্যের চেয়ে অনেক বেশি, তথাপি ফলন কম। এজন্য অনেক চাষি এসব ফসল চাষে প্রথম প্রথম আগ্রহ দেখালেও পরে পিছিয়ে যান। তাই আদিজাতসমূহ মুঠ করে বসে থাকলে আমরা এখন আর বিশ্ব বাজারের সাথে সুগন্ধি গাছ উৎপাদনে পেরে উঠবো না। এ দেশের চাষিদের সুগন্ধি ফসল চাষে ক্রমাগত নিরুৎসাহ ও তুলনামূলকভাবে কম লাভ হয়তো একদিন এ দেশে সুগন্ধি গাছের চাষে চরম ভাটা ডেকে আনবে। তাই যুগপোযোগী উচ্চফলা জাত উদ্ভাবন বা প্রবর্তন এখন জরুরি। বিশেষ করে যেসব সুগন্ধি গাছের উচ্চ বাণিজ্য সম্ভাবনা ও চাহিদা রয়েছে। মৌরি, মেথি, কালোজিরা ইত্যাদি এ দেশে চাষ হলেও তার উৎপাদনে কোন পরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা নেই। অথচ দেশীয় বাজারে এসব মসলা ফসলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অনেকটা হেলাফেলা করেই এসব ফসল চাষ করা হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট মসলা ফসলের কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে সত্য, তবে মাঠে সেসব জাত ততটা সাড়া ফেলতে পারেনি। এসব জাতের চাষ সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তির অনুশীলনও জরুরি। অধিকাংশ সুগন্ধি মসলা ফসলই এ দেশের জলবায়ুতে রবি তথা শীত মৌসুমে ফলে। তাই রবি মৌসুমে মসলা ও সুগন্ধি ফসল চাষে এখন থেকেই আগাম পরিকল্পনা, পরিকল্পিতভাবে উপযোগী জমি ও এলাকা নির্বাচন, চাষি বাছাই ও প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের বীজ ও উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণন শৃঙ্খল তৈরি ইত্যাদি পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

 

This post has already been read 611 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN