১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০, ৬ শাওয়াল ১৪৪১
শিরোনাম :

বাংলাদেশে পঙ্গপাল: বিভ্রান্তি নয়, সতর্ক হোন

Published at মে ৩, ২০২০

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : বিপর্যয় যখন আসে পর্যায়ক্রমে আসে। বিপর্যয়ের সময় আতঙ্ক থেকে বিভ্রান্তিও ছড়ায় খুব দ্রুত বাতাসে। সমগ্র বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে, হর্ণ অব আফ্রিকা থেকে পঙ্গপালের দল তখন মরু অঞ্চলের আরেক দলের সাথে যুক্ত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ হয়ে পাকিস্থান, এমনকি আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের কিছু কিছু রাজ্যে হানা দিয়ে ধ্বংশ করছে ফসলের জমি। পঙ্গপাল ভারতে হানা দেওয়ায় বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া শঙ্কিত হয়ে পঙ্গপালের ক্ষয়ক্ষতির উপর রিপোর্ট প্রচার করেন এবং বাংলাদেশেও অনুপ্রবেশ করবে কিনা এমন শঙ্কা প্রকাশ করেন। অসম্ভব কিছু নয়। অনুকূল আবহাওয়া, প্রজননক্ষেত্র ও খাদ্য পেলে দেশের সীমানা অতিক্রম করতে পঙ্গপালের কোন পাসপোর্ট-ভিসা লাগবে না।

পঙ্গপাল সম্পর্কে বলার পূর্বে সম্প্রতি বাংলাদেশের টেকনাফে ঘাসফড়িংসদৃশ যে পোকার ছবি বা ভিডিও বিভিন্ন জাতিয় পত্রিকা ও টিভি সংবাদে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে, সে পোকাকে অনেকেই পঙ্গপাল ভেবে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কিংবা অনেকে মরু পঙ্গপালের প্র্রজাতিও উল্লেখ্য করেছেন। ভিডিও ফুটেজ ও ছবি (যদিও স্পষ্ট ছিল না) দেখে প্রথমেই আমার ধারণা ছিল এটা মরু পঙ্গপাল প্রজাতি পোকাতো নয়ই, এমনকি আ্যক্রিডিডি পরিবারেরও (পঙ্গপাল/ঘাসফড়িং পরিবার) পোকা নয়। কারন ছবিতে পোকার মাথা (যদিও মুখপাঙ্গ অস্পষ্ট), এন্টেনা ও শরীরে লম্বা ডোরাকাটা কালো ও ঈষৎ সোনালী রঙ দেখে ধারণা করেছিলাম এই পোকাটি পঙ্গপাল গোত্রের পিরগোমরফিডি (Pyrgomorphidae) পরিবারের কোন একটি সদস্য হবে। পোকার অপরিণত অবস্থা (নিম্ফাল স্টেজ) দেখে প্রজাতি সনাক্তকরণ খুবই দূরহ। তাই এ ক্ষেত্রে  টেক্সোনমিস্টগন বাহ্যিক সনাক্তকরণের পাশাপাশি মলিকুলারলিও সনাক্তকরণের মাধ্যমে অপরিনত পোকার প্রজাতি নিশ্চিত হন।

কীটতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর পঙ্গপাল বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় টেকনাফে ঘাসফড়িংসদৃশ পোকাকে পিরগোমরফিডি (Pyrgmorphidae) পরিবারের অলারচেস মিলিয়ারিস (Aularches miliaris) প্রজাতি হিসেবে প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করেছেন। যদিও এ পরিবারের আরো বেশ কয়েকটি প্রজাতি আছে যারা অপরিণত অবস্থায় দেখতে বাহ্যিকভাবে প্রায় একই রকম। ভিন্নতা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় পূর্ণাঙ্গ অবস্থায়। তাই টেকনাফ থেকে এই অপরিনত পোকা সংগ্রহ করে তা মলিকুলারলি সনাক্তকরণ করে প্রজাতি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন অথবা ঐখানকার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সহায়তায় পূর্ণাঙ্গ পোকা পাওয়া সম্ভব হলেও প্রজাতি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব কারন এ পরিবারের ফড়িংগুলো বেশ রঙিন হয়ে থাকে যা দেখে সহজেই চেনা যায়। আমি মনে করি এ পোকাকে পঙ্গপালের প্রজাতি ভেবে আর বিভ্রান্ত না হয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে দমন করা প্রয়োজন।

পৃথিবীর সব দেশেই পোকার বায়োক্যাটালগ বা চেকলিস্ট থাকে। এ চেকলিস্টের কাজগুলো মূলতঃ কিউরেটর/ টেক্সোনমিস্টগন করে থাকেন। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে এখনো পরিপূর্ণ কোন ইনসেক্ট চেকলিস্ট তৈরি হয়নি। একটি পরিপূর্ণ ইনসেক্ট চেকলিস্ট থাকলে নতুন কোন প্রজাতির সন্ধান পেলে সহজে বলা যায় এই প্রজাতির পোকাটি দেশে নতুন নাকি পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। আমি আশাবাদি বাংলাদেশের কীটতত্ত্ববিদগন যদি দায়িত্ব নিয়ে পোকার গোত্র ভাগ করে সম্মিলিত কাজ করেন তাহলে দেশকে একটি পরিপূর্ণ ইনসেক্ট বায়ো রিসোর্স উপহার দেয়া যাবে।

পঙ্গপাল কী? ইতোমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ার প্রকাশনা ও প্রচারণায় পঙ্গপাল ও তাদের ক্ষতি সম্পর্কে সবারই কিছু ধারণা হয়েছে। পঙ্গপল আ্যক্রিডিডি পরিবারের এমন সদস্য যা বাইফেজিক: একটি সলিটারি (যারা ফসলের জন্য তেমন ক্ষতিকারক নয়, সংখ্যায় অনেক কম, শান্ত, রাতে উড়ে); অন্যটি গ্রেগারিয়াস (যারা ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক; সংখ্যায় অনেক বেশী; অশান্ত, দিনে উড়ে)। পঙ্গপাল সলিটারি ফেজ থেকে গ্রেগারিয়াস হয় যখন তাদের সংখ্যা হঠাৎ করে বাড়তে থাকে। সংখ্যা বেড়ে গেলে একে অন্যকে স্পর্শের মাধ্যমে বিরক্ত করতে থাকে এবং তাদের আচরণে পরিবর্তন ঘটাতে থাকে। অপরিণত (নিম্ফ) পোকাগুলো যখন একত্রিত হতে থাকে তাকে হোপার ব্যান্ড এবং পরিণত (এডাল্ড) পোকাগুলো যখন একত্রিত হয়ে দলবদ্ধ অবস্থায় থাকে তাকে সোয়ার্ম বলে। এ সোয়ার্মই হলো পঙ্গপাল।

পঙ্গপাল তাদের প্রজননের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাতসহ উষ্ণ আবহাওয়া পছন্দ করে। বৃষ্টিপাতের পরই তাদের প্রজনন শুরু হয় কারন তাদের ডিম পাড়ার জন্য আর্দ্র বালি মাটির প্রয়োজন যার ১০-১৫ সে.মি. গভীরে তারা ডিম পাড়ে। তাই বৃষ্টিপাতের পরই তাদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় এবং তারা দলবদ্ধ হতে থাকে। বিশ্বে বর্তমানে এই পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাবের কারন হিসাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু ও আবহাওয়া পরিবর্তন, ২০১৮ সালের সাইক্লোন, ২০১৯ এর শেষে অপ্রত্যাশিত প্রচুর বৃষ্টিপাতসহ উষ্ণ আবহাওয়া। বাংলাদেশে শুষ্ক ও খরা প্রবন এলাকা, চর এলাকা ও হাওড় এলাকা যা পঙ্গপালের প্রজননের জন্য অনুকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব প্রজনন অনুকূল জায়গা সতর্কতার সাথে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

পঙ্গপাল সাধারণত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই পঙ্গপালের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে সর্বদা সতর্ক থেকে পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলেছেন পঙ্গপালের আক্রমনের সম্ভাবনা এ বছর কম। এ বছরের তুলনায় আগামি বছর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে পঙ্গপালের আক্রমন দেখে প্রস্তুতি শুরু করলে তা নিয়ন্ত্রন করা কঠিন হয়ে যাবে। বিশ্বে পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রনে রাসায়নিক পদ্ধতির পাশাপাশি পরিবেশ বন্ধব বায়োপেস্টিসাইড ব্যবহার চলছে।স্বল্প সময়ের চাহিদায় অধিক পরিমান বায়োপেস্টিসাইড যোগান দেয়া সম্ভব হয় না বলে বাধ্য হয়ে রাসায়নিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। তাই পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রনে বায়োপেস্টিসাইড হিসাবে মেটারাইজিয়াম এনিসপলি (Metarhizium anisopliae) কিংবা মেটারাইজিয়াম এক্রিডাম (Metarhizium acridum) ছত্রাকের ব্যবহার করা যেতে পারে এবং সংশ্লিষ্টগণ এ ব্যপারে পূর্ব প্রস্তÍতি রাখতে পারেন। এই ছত্রাকে যেহেতু পঙ্গপাল মারতে ৭-১৪দিন সময় লাগে তাই পঙ্গপালের অপরিণত অবস্থায় (হোপার ব্যান্ড) ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশের ফসলি জমি ও খাদ্য নিরাপত্তার নিমিত্তে কৃষি মন্ত্রনালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সম্মিলিতভাবে পঙ্গপালের বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে।

লেখক : কীটতত্ত্ব বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

This post has already been read 2499 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN