২ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ জুন ২০১৯, ১৩ শাওয়াল ১৪৪০
শিরোনাম :

দৈন্যদশা কাটছে পাটকলের, ফিরছে সোনালী দিন

Published at আগস্ট ৭, ২০১৭

* ২৮শ কোটি টাকায় সব পাটকল আধুনিকায়নের পরিকল্পনা
* চীনা বিনিয়োগে পাটকল চালুর উদ্যোগ
* তিন পাটকলের ২৫ একর উদ্বৃত্ত জমি লীজ দেয়ার প্রস্তাব

jute-industry-in-bangladeshসাখাওয়াত হোসেন: রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলো দৈনদশা কাটছে। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে আধুনিকায়নের। এজন্য দেশের ২৭টি পাটকলের জন্য প্রায় ২৮শ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। চালু মিলকে আরো সচল করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। একই সাথে পাটকলের অভ্যন্তরের উদ্বৃত্ত জায়াগাতে নতুন করে পাটসংশ্লিষ্ট শিল্প স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পাটকলের অভ্যন্তরে উদ্বৃত্ত জমিতে প্রক্রিয়াজাত পাট পণ্যের নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনে তিনটি মিলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব মিলের উদ্বৃত্ত জমি লীজ প্রদানের মাধ্যমে নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এ  সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে বিজেএমসি থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিজেএমসির আওতাধীন ২৭টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে একটি বন্ধ। কয়েকটি পরিক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে। তবে বেশিরভাগই লোকসানে চলছে। ২০১৪ সনে দেশের সবকটি মিলের যন্ত্রাংশ আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিজেএমসির মিলগুলোকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি প্রিলিমিনিয়ারী ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট তৈরি করা হয়। এরপর একই বছরের আগস্টে চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তির আওতায় চীনের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের পাটকলগুলো পরিদর্শন করেন।

বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, চীনের প্রতিনিধি দলটি আমীন জুট মিলস, করিম জুট মিলস এবং প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলে বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত করেছে। যা জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি এখনও বাংলাদেশের আরো কয়েকটি পাটকল পরিদর্শন অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে চীনের বিনিয়োগে চিহ্নিত মিলের নামও পরিবর্তন হতে পারে।

বিজেএমসির এক কর্মকর্তা জানান, পাটকল আধুনিকায়নের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে পাটের ব্যবহার বাড়ানো, দেশের চাহিদা পূরণ এবং বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পাটকে পৌঁছে দেয়া। চীন আমাদের সাথে পাটকল নিয়ে কাজ করবে। তারা পাটকল পরিদর্শন করছে। একই সাথে বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দলও দেশের পাটকলগুলো পরিদর্শন করেছে। বুয়েট থেকে আমরা যে প্রতিবেদন পাব সেটি থেকে বোঝা যাবে এসব মিল আধুনিকায়ন করতে কত টাকার প্রয়োজন হবে। এবং তাদের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে বলা যাবে চীন আমাদের দেশের পাটকল আধুনিকায়নের জন্য কত টাকা বিনিয়োগ করবে। তিনি বলেন, চীন ছাড়াও আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে তিনটি মিল আধুনিকায়ন করা হবে। এগুলো হচ্ছে ইউএমসি জুট মিলস, জাতীয় জুট মিলস এবং গলফ্রা হাবিব জুট মিলস (নন-জুট)।

পাটকলের অভ্যন্তরে উদ্ধৃত্ত জমিতে নতুন শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে বিজেএমসি। গেল বছরের ডিসেম্বরে কমিটি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। যেখানে বলা হয়, পাটকলের অভ্যন্তরে যে খালি জায়গা আছে সেখানে পাট প্রক্রিয়াকৃত পণ্যের নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এজন্যই চিহ্নিত করা হয়েছে নরসিংদী ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলের ১৪ একর জায়গা। রাজশাহীর রাজশাহী জুট মিলের ৬ একর জায়গা এবং কেএমটি জুট মিলের ৫ একর জায়গা। বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, এই ২৫ একর জায়গা ৫ বছরের জন্য বেসরকারিখাতে লীজ প্রদান করা হবে এবং পাট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এসব জায়গায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

দেশের পাট শিল্প্রে উন্নয়নে এর আগে বিলুপ্ত প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের মাধ্যমে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্ত সেসময় পাটকল বিক্রি ও বিক্রির পর পাটকল সম্পূর্ন চালু না হওয়ায় কার্যকারিতা হারায় বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়াটি। প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জের নবারুণ জুট মিলস ২০০৫ সনে। মিলের অভ্যান্তরে ৪৫ দশমিক ৮৮ একর জায়গা থাকলেও মিলটি এখন আংশিক চালু রয়েছে বলে কমিশনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গাজীপুরের নিশাত জুট মিলস বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয় ২০০৩ সনে। সেটি এখন আংশিক চালু রয়েছে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া বাওয়া জুট মিলস এখন বন্ধ হয়েছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শ্রমিক কর্মচারিদের কাছে হস্তান্তর হওয়া ময়মনসিংহের ময়মনসিংহ জুট মিলস বর্তমানে আংশিক চালু রয়েছে। এ মিলের অভ্যন্তরে প্রায় ৪৫ দশমিক ৬১ শতাংশ জায়গা রয়েছে।

এছাড়া প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের মাধ্যমে সমীক্ষা চালানো হয় বিজেএমসির আওতাধীন রাজশাহী জুট মিলসের। সে সময় তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মিলটি বর্তমানে চালু রয়েছে। তবে লোকসানে রয়েছে।  মিলটির দায় দেনার (চলতি, দীর্ঘমেয়াদি ও অন্যান্য) পরিমাণ বলা হয় ১৯৪ কোিট টাকা।

বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) সেক্রেটারি এমএ বারিক খান এ প্রতিবেদককে বলেন, বিজেএমসি নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকলগুলো সব সময়ই সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়ে থাকে। সে তুলনায় বেসরকারি পাটকলগুলোকে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে হয়। চীন আমাদের দেশের পাটকলগুলোর আধুনিকায়নের জন্য বিনিয়োগ করবে এটি ভালো খবর। এতে আমাদের পাটকলগুলোর আবার নতুন করে চালু হবে। এসব মিল চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে।

তিনি বলেন, পাটকলের উদ্বৃত্ত জমি লীজ প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তদের প্রধান্য দেয়া যেতে পারে। একই সাথে বেসরকারিভাবে অনেকই পাট সংশ্লিষ্ট শিল্পের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। তাদেরকে এসব জায়গা সহজ শর্তে লীজ প্রদান করা হলে অন্যান্য উদ্যেক্তারাও দেশের পাট শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হবে।

এ বিষয়ে পাটের লড়াই এর উদ্যোক্তা নাসিমুল আহসান বলেন, দেশের পাটকলগুলোর প্রযুক্তির উন্নয়নের দাবী দীর্ঘদিনের। চায়নার সাথে যে চুক্তি হয়েছে সেটি যদি সম্পন্ন হয় তাহলে প্রযুক্তির ব্যবহারে আরো উন্নত হবে। আমাদের দেশের কাঁচা পাটের চাহিদা বাড়বে। উৎপাদন বাড়বে। উদ্বৃত্ত জমির লীজ দেয়ার ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

This post has already been read 3745 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN