৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৪ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯
শিরোনাম :

দেশের বিজ্ঞানীদের নয়া আবিষ্কার: বালাইনাশক ছাড়াই বাড়বে স্ট্রবেরীর উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্ট্রবেরি বাংলাদেশের একটি নতুন ফলের ফসল, যা উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের কাছেই যথেষ্ট আগ্রহ অর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে মাটি এবং বায়ুবাহিত বিভিন্ন রোগ ও কীটপতঙ্গ থেকে স্ট্রবেরি উদ্ভিদ ও ফল রক্ষা করার জন্য উচ্চ মাত্রার সিনথেটিক বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়, যা ভোক্তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। নতুন উদ্ভাবিত  জৈব প্রযুক্তি পদ্ধতিটি বাংলাদেশে স্ট্রবেরির উৎপাদন বাড়াতে এবং ভোক্তার স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করবে বলে জানা যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমআরএইউ) -এর গবেষকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকর্মীর সাথে কাজ করে মরিচ এবং ধানের শিকড় থেকে দুটি নতুন ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন যা কোন রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার না করে স্ট্রবেরির ফলন ৪৮% বৃদ্ধি করে। এই প্রাকৃতিক এজেন্ট স্ট্রবেরি ফলে ব্যবহার করে এজেন্ট ব্যবহার না করা ফলের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি বিভিন্ন সেকেন্ডারি বিপাক যেমন ফেনলিক ও ভিটামিন সি পাওয়া গেছে। উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকলাপ সমৃদ্ধএই স্ট্রবেরি ক্যান্সার সহ বিভিন্ন রোগ থেকে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিএসএমআরএইউ’র জীব প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তোফাজ্জাল ইসলাম গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যিনি সায়েন্টিফিক রিপোর্ট, নেচারপাবলিশিং গ্রুপ-জার্নালে সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধের করেস্পন্ডিং অথর বা সংশ্লিষ্ট লেখক তিনি এগ্রিনিউজ২৪.কম কে বলেন, গবেষক দল তাদের জীব ব্যাংকের ৬৫০টি স্থানীয় উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বাছাই করে দুটি নতুন ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেছেন। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে উচ্চমানের স্ট্রবেরি উৎপাদনের জন্য এই দুটি ব্যাকটেরিয়া এখন প্রাকৃতিক জৈব-বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। জিনোম সিকোয়েন্সিং করে বিসিএইচআই১ এবং বিআরআরএইচ-৪ স্ত্রেইন/গ্রুপ যথাক্রমে ব্যাসিলাস এ্যামোলোলিকফাইয়েন্সস এবং পারবুরকহোধেরিয়া ফাঙ্গুয়ের হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

তিনি জানান, গবেষণায় আরো দেখা যায়- ধান ফসলে বিআরআরএইচ-৪ ব্যবহার করে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম সারের ব্যবহার ৫০% কমিয়ে ধানের উৎপাদন ২০% বৃদ্ধি করে, যা আমরা সম্প্রতি অন্য আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘রাইস সায়েন্সে’ প্রকাশ করেছি।

অধ্যাপক ড. মো. তোফাজ্জাল ইসলাম

অধ্যাপক ইসলাম বলেন, “আমরা স্থানীয় উদ্ভিদের শিকড় থেকে বিসিএইচআই ১ এবং বিআরআরএইচ-৪ আবিষ্কার করেছি যা স্ট্রবেরি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রাকৃতিক জৈব বালাইনাশক এবং জীব উদ্দীপকের শিল্প উৎপাদনের জন্য নবায়ণযোগ্য জীব সংস্থান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এই জীব সংস্থান প্রয়োগ করলে এগুলো মাটির স্বাস্থ্যকে উন্নত করবে, পরিবেশগত দূষণ কমাবে এবং সিনথেটিক রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে উৎপন্ন গ্রীনহাউজ গ্যাস থেকে মুক্ত করবে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল স্ট্রবেরির উৎপাদন খরচ কমাবে।

তিনি আরো বলেন, দেশের দরিদ্র কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসের জন্য বিকল্প প্রযুক্তি প্রয়োজন যাতে সিনথেটিক/সাংশ্লেষিক বালাইনাশক ব্যবহার কম হয়। স্ট্রবেরি ক্যারটিনয়েড, ভিটামিন, অ্যানথোসায়ানিন, ফেনলস এবং ফ্লেভনয়েডসহ প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমূহ ও মুক্ত র‍্যাডিকলসমূহ ধ্বংস করার একটি চমৎকার উৎস। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, স্ট্রবেরিগুলিতে উপস্থিত মেজর ফেনোলিক যৌগ যেমন ফ্লেভনয়েড উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ক্যান্সার বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করেন। এই উচ্চ মাত্রায় সেকেন্ডারি মেটাবলাইট যুক্ত স্ট্রবেরি মানুষের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রকল্পের প্রধান অনুসন্ধানকারী ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, স্ট্রবেরি বিভিন্ন ছত্রাক এবং অণুজীবঘটিত রোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশের উচ্চ আর্দ্রতা এবং উষ্ণ আবহাওয়া রোগ প্রাদুর্ভাবের জন্য অনুকূল। উপরন্তু, একই জমি একই ফসলের বারংবার উৎপাদনের ফলে এ ঝুকি আরো বেড়ে যায়। তাই বিভিন্ন কীটপতঙ্গ থেকে এই নতুন ফসল রক্ষা করতে বাংলাদেশের স্ট্রবেরি চাষিরা অননুমোদিতভাবে অনেক কৃত্রিম রাসায়নিককে ককটেল হিসেবে ব্যবহার করে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুটি ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রবেরির রোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দমনমূলক ক্রিয়া থাকায় কৃত্রিম রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের নিরাপদ ও সুস্বাদু স্ট্রবেরির টেকসই উৎপাদন উন্নীত করার জন্য জৈব-বালাইনাশক হিসেবে এটিকে শিল্পায়িত করা উচিত। বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা রাসায়নিকের পরিবর্তে পরিবেশগত বন্ধুত্বপূর্ণ জৈব বালাইনাশক উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও এই দুইটি উদ্ভিদ প্রোবাইয়োটিক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে স্ট্রবেরি ফলের মধ্যে সেকন্ডারি মেটাবলাইট অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষাবাদ করলে এটি গ্রাহকদের ভালো স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান করবে বলে জানান ড. রহমান।

এ ব্যাপারে বিএসএমআরএইউ’র ভাইস চ্যান্সেলর এবং প্রকাশিত নিবন্ধের সহ-লেখক অধ্যাপক ড. গিয়াসউদ্দিন মিয়া বলেন, এই গবেষণায় আবিষ্কৃত দুটি উদ্ভিদ প্রোবোবোটিক ব্যাকটেরিয়া জৈব-বালাইনাশক এবং জৈব-উদ্দীপক হিসেবে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন। এই  জৈব সংস্থান উদ্ভিদে ব্যাপক মাত্রায় প্রয়োগে শুধু ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফলের স্বাস্থ্য উপকারী বায়োকেমিক্যালস/ জৈব রসায়ন বাড়াবে না বরং উল্লেখযোগ্যভাবে উৎপাদন খরচ এবং পরিবেশ দূষণও হ্রাস করবে। বিএসএমআরএইউ দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের পরিবেশগত জৈব প্রযুক্তি বিকাশের চেষ্টা করছে এবং বর্তমান গবেষণাটি অবশ্যই একটি বড় সাফল্য।

উল্লেখ্য, গবেষণাটি ইউএসডিএ ফরেন এগ্রিকালচার সার্ভিস (এফএএস) প্রোগ্রাম কনট্র্যাক্ট এজিআর নম্বর এসআর-সিআর-১৩-০০২ এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণামূলক বীজ প্রদানে সহায়তা এবং বিএসএমআরএইউ-র বায়োটেকনোলজি বিভাগে বাস্তবায়নাধীন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হেকেপ সিপি#২০৭১ প্রকল্পের আংশিক অর্থায়নে পরিচালিত।

This post has already been read 681 times!

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*