৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৪ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯
শিরোনাম :

দুটি পাতা একটি কুঁড়ি, অতঃপর ‘চা’ হওয়ার গল্প

green-tea-leavesড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

আমি গ্রীন টি-এর একজন বিশেষ ভক্ত। এক মগ গরম পানি তাতে এক চিমটে গ্রীন টি। বেশ আয়েশ করে তবে চলে এর পান পর্ব। ডানকান ব্রাদার্সের মাঝদিহি টি এস্টেটে যেয়ে একবার বড় শখ হলো চা কি করে তৈরি করা হয় সেটি ভালো করে দেখে নেয়া। তাত্ত্বিক কিছু ধারণা আমার আগে ছিল বটে, তবে নতুন করে তা আবার বাস্তবে দেখে নেবার ইচ্ছেটা আর লুকাতে পারলাম না। আমার চেয়ে এক কাঠি সরস আমার ছাত্র বশির। যেন সে নিজে থেকেই এ প্রস্তাবটি দেবার জন্য মুখিয়ে ছিল। সন্ধ্যে বেলাতেই চলে গেলাম চা তৈরির কারখানাতে।

চায়ের পাতা যারা সংগ্রহ করে তারা মূলত নারী। দু’টি কারণে নারীদের এ কাজ দিয়ে থাকেন চা বাগানের বাবুরা। তাদের কাজে ফাঁকি দেবার প্রবণতা একেবারে নেই। আর দুই, বেশ সুইফট তারা দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি সংগ্রহ করে নিতে পারে। মাথার পেছনে ঝুলানো ঝুড়ি আর দক্ষ দু’টি হাত এ কাজের প্রধান দু’টি অনুসঙ্গ। তো এভাবে সংগ্রহ করা পাতা ওজন করতে হয় বাগানেই। এরপর তা চালান করে দেয়া হয় কারখানায়। বাগানে এরকম চা পাতা ওজন করার ব্যবস্থা দেখলাম বেশ কয়েক স্থানে। সেসব চা পাতা এনে অতঃপর দিয়ে দেয়া বিশাল এক একটি ট্রের ওপর বিছিয়ে। লক্ষ্য হলো এদের আর্দ্রতা খানিকটা কমিয়ে নেওয়া। চা তৈরির কারখানায় এই কাজটি করার স্থানটি বেশ বড় সড়। আর ট্রে-এর সংখ্যাও দেখলাম অনেক। আবার উপরে নিচে স্তরে স্তরে বসানো এসব ট্রে। বাড়তি উত্তাপ দেবার ব্যবস্থা আছে এক মাথায়। হিট চলে যায় প্রতি ট্রেতে। আছে বাতাস দিয়ে আর্দ্রতা কমাবার ব্যবস্থাও। পাতা বেশি ভেজা হলে এদের আর্দ্রতা কমাবার জন্য রয়েছে হিট ছড়িয়ে দেবার সুব্যবস্থা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসব আমাদের দেখিয়ে দিল বশির।
green-tea
পাতার অতিরিক্ত পানি বিয়োজনের এবং অল্প খানিকটা জারণ ঘটাবার জন্য এই যে ব্যবস্থা একে বলা হয় উইদারিং। এই প্রক্রিয়া শেষে পানি বিয়োজনের ফলে পাতার ওজন হ্রাস পায় চার ভাগের একভাগ। উইদারিং প্রক্রিয়ার কারণে পাতার মধ্যে ভৌত ও রাসায়নিক দু’রকমের পরিবর্তনই ঘটে। এ সময় পলিফেনোলঅক্সিডেজ এনজাইমের কর্মকা- বৃদ্ধি পাওয়ায় গাজন প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়। পাতায় বিদ্যমান আমিষ ভেঙ্গে গিয়ে এমিনো এসিডে রুপান্তরিত হয় আর পাতায় মুক্ত ক্যাফেইনের প্রাপ্যতা বেড়ে যায়। এ দু’টি কারণে চায়ের স্বাদ বেড়ে যায়। এমনকি এ সময় পাতায় জৈব এসিডের পরিমাণ বাড়ায় চায়ের পাতায় সুগন্ধ চলে আসে।

এবার ঢুকে গেলাম আরও নিয়ন্ত্রিত প্রকৃত বিশাল এক চা প্রক্রিয়াকরণ প্লাণ্টের ভেতর। স্তরে স্তরে বসানো নানা রকম যন্ত্রপাতি। উইদারিংয়ের পরের ধাপ দেখলাম এখানে। এই ধাপে এসে পাতাগুলো যন্ত্রের মাধ্যমে কেটে কেটে ক্ষুদ্রাকার আকৃতিতে পরিণত হয়। এ সময় পাতার কোষও ভেঙ্গে যায় অনেকটাই। পাশাপাশি চাপের ফলে পাতা থেকে কিছু রস বেড়িয়ে আসে। ছিন্ন পত্রের গাত্রে একটি পাতলা রসের ফিল্ম তৈরি হয়ে যায়। এর ফলে পাতার ভেতরকার তৈলজাতীয় পদার্থও বেড়িয়ে আসে। এ কারণেই চায়ের বৈশিষ্ট্যম-িত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এই পুরো ধাপটিকে বলা হয় রোলিং।

এর পরের ধাপটি হলো জারণ বা গাজন। যেসব চা তৈরি করতে জারণ প্রয়োজন তাদেরকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রেখে দেয়া হয় যেন তা ধীরে ধীরে গাঢ় বর্ণ ধারণ করে। কখনো কখনো এর জন্য খ-িত পাতাগুলোকে যান্ত্রিকভাবে নাড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন হয়। এ সময় পাতাদের ভেতরে বিদ্যমান ক্লোরোফিল এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙ্গে যায় এবং এর ভেতরকার ট্যানিন অবমুক্ত বা কখনো কখনো রুপান্তরিত হয়। চা শিল্পে একে গাজন করা বলা হয়। কি ধরনের চা তৈরি করা হবে তার উপর ভিত্তি করে কখন জারণ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে তা। হালকা ওলং চায়ের জন্য শতকরা ৫-৪০ ভাগ জারণ করলেই চলে, গাঢ় ওলং চায়ের ক্ষেত্রে জারণ করতে হয় শতকরা ৬০-৭০ ভাগ। তবে ব্ল্যক চা তৈরি করতে হলে জারণ চালাতে হয় শতকরা ১০০ ভাগ। জারণ প্রক্রিয়ার কারণে স্বাদ এবং গন্ধের জন্য দায়ী বহু যৌগ তখন উৎপন্ন হয়। এ সময় সবুজ টুকরো টুকরো পাতা তাজা বর্ণ ধারণ করে।

এবারকার কাজটি হলো পাতা না পুড়ে একে সমভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে শুকানো। পাতা শুকানো মানে হলো পাতার গাজন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া। এ সময় পাতার আর্দ্রতা শতকরা ৫৫-৬০ ভাগ থেকে কমতে কমতে শতকরা ২-৩ ভাগে পৌঁছে। শুকানোর সময় যত বেশি লাগবে চায়ের মান ও গন্ধ তত তাতে কমবে। আবার যত দ্রুত শুকানোর কাজটি চলবে তত চা পাতলা হয়ে যাবে। অন্যদিকে তাপমাত্রা যত বেড়ে যাবে চার স্বাদ তত তেতো হবে। ফলে অনেকগুলো বিষয় মাথায় রেখে পাতা শুকানোর কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। গ্রীন চা তৈরির জন্য এই শুকানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক নতুন গন্ধ প্রদায়ী যৌগের আবির্ভাব ঘটানো হয়।

সব রকম চা তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজন না হলেও কোন কোন চা তৈরির ক্ষেত্রে বাড়তি কিছু গাজন সম্পন্ন করার প্রয়োজন পড়ে। গ্রীন চা- পিউআরহ তৈরি করতে বাড়তি গাজন না করলে চায়ের স্বাদ হয় খানিকটা তেতো এবং স্বাদটা হয় ম্যাড়ম্যাড়ে। যখন এদের বাড়তি গাজন করা হয় তখন পাতার মিষ্টতা ও স্বাদ ফিরে আসে। ওলং চা তৈরির সময় যদি চায়ের পাতা কয়লার আগুনের উপর দিয়ে নেয়া হয় তবে তা উত্তম হয়। পুরো এই ধাপটিকে বলা হয় এজিং বা কিউরিং। সুগন্ধী চা তৈরির জন্য এই ধাপে চায়ের পাতায় সুগন্ধী দ্রব্য যুক্ত করে দিতে হয়।

এবার হলো চা থেকে আঁশ সরিয়ে ফেলা এবং বিভিন্ন আকৃতির চায়ের দানা আলাদা করে ভিন্ন ভিন্ন রকমের চা প্যাকেটজাত করার কাজ। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় সর্টিং ও গ্রেডিং। চায়ের ভিন্ন ভিন্ন দানা আলাদা করার মাধ্যমে চায়ের গুণগত মান এবং এদের ভিন্ন বাহ্যিক কাঠামো স্পষ্ট হয়ে উঠে। নানা রকম চালনির মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্রেডের চা গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে জমা হয় ভিন্ন ভিন্ন বস্তায়। এদের এভাবে চালান করে দেওয়া হয় নানা স্থানে। অতঃপর এদের প্যাকেটজাত করে ভিন্ন গ্রেডের চা হিসেবে এরা চলে যায় বাজারে ভোক্তাদের কাছে।

চা অনেকের কাছে বড় প্রয়োজনীয় একটি পানীয়। কিছুতেই দিনে দু’চার কাপ চা ছাড়া চলে না অনেকের। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কত মানুষ গ্রাম গঞ্জে নানা ইস্যু নিয়ে ঝড় তুলে চায়ের স্টলে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লেখক শিল্পী খুঁজে নেন তাদের শিল্প কর্মের কত প্লট। আয়েসে চায়ের স্বাদ গ্রহণ করতে করতে ক্লান্তিকে নির্বাসনে পাঠাবার আয়োজন করে অনেকেই। এই যে চা পানের মধ্য দিয়ে মানুষের নানা কর্মকা- গতি পায় তাদের কতজন আসলে ভাবেন কত দীর্ঘ নানা জটিল ধাপ অতিক্রম করে দুই পাতা আর এক কুঁড়ি রূপান্তরিত হতে হতে আমাদের কাক্সিক্ষত চা গুড়ায় রূপ নেয়। কত ঘাম, মেধা আর শ্রমের বিনিময়ে আমরা পাই চায়ের মত বহুল ব্যবহৃত এবং উপকারী একটি পানীয় বস্তু। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি সেসব কথা ভাবছিলাম ডানকান ব্রাদার্সের ছোট সাহেবের বাংলোয় বসে বসে।

লেখক : অধ্যাপক (শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), ফসল উন্নয়ন গবেষক, উদ্ভাবক।

This post has already been read 388 times!

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*