৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১ রবিউল-আউয়াল ১৪৪১
শিরোনাম :

ছাগলের পিপিআর রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

Published at নভেম্বর ৫, ২০১৯

পিপিআর রোগে আক্রান্ত ছাগল।

ডা: এইচ এম সাইদুল হক : পিপিআর (পেসটি ডেস পেটিটস্ রুমিন্যান্টস্) রোগ সর্বপ্রথম ১৯৪২ সালে আইভোরী কোস্টে সনাক্ত করা হয়। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ রোগ প্রথম দেখা দেয়। প্রধানত ছাগলই এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে ভেড়াতেও এ রোগ দেখা দিয়ে থাকে। হরিণ এ রোগের প্রতি সংবেদনশীল। মানুষের দেহে এ রোগের সংক্রমণ ঘটে না। অধিক দুর্বল, ধকলযুক্ত অবস্থা, একই সময়ে পরজীবী ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যেতে পারে। যমুনাপারি জাতের ছাগলের চেয়ে (৩২.৭৬%) দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট জাতের ছাগলে (৬৭.২৮%) অধিক সংক্রমণ ঘটে বলে জানা গেছে।

পিপিআর ছাগল ও ভেড়ার একটি ভাইরাসজনিত রোগ হলেও তা ছাগলের ক্ষেত্রে প্রায়শ অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে থাকে এবং মহামারী আকারে দেখা দেয় যেখানে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় সেখানে প্রায় শতকরা ১০০ ভাগ পর্যন্ত ছাগল আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ছাগলের মৃত্যুহার শতকরা ৫০-৮০ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। সববয়সের ছাগলই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে তবে এক বছর বয়স পর্যন্ত ছাগলই অধিক সংখ্যায় আক্রাšত হয়ে থাকে। পিপিআর রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাগলের প্রাণহানি ঘটে এবং এর ফলে শত শত কোটি টাকার প্রাণিসম্পদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কারণ : সাধারণত বাজার বা অন্য কোনো স্থান থেকে ক্রয়কৃত প্রাণী খামার বা নিজস্ব ছাগল-ভেড়ার পালের সাথে রাখলে রোগের বিস্তার ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদের প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক ছাগল-ভেড়া বিক্রির জন্য দেশের প্রধান প্রধান এমনকি ছোট হাট-বাজারেও একত্রিত করা হয়। প্রধানত এখান থেকেই রোগের বিস্তার আরো ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। আবার অবিক্রিত পশু ফিরিয়ে নিয়ে নিজের খামার বা পালের ছাগল-ভেড়ার সাথে রাখলেও রোগের বিস্তার ঘটে থাকে। ছাগলের ক্ষেত্রে এ রোগে মৃত্যুহার ৫৫-৮৫% পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করা গেলেও ভেড়ার ক্ষেত্রে তা ১০%-এর নীচে থাকে বলে জানা গেছে। এ রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে ঋতুর প্রভাবের বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়নি। তবে যেটা লক্ষ্য করা গেছে তা হচ্ছে, মাতৃপ্রদত্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  প্রায় চার মাসের পর্যন্ত বজায় থাকে।

লক্ষণসমূহ : এ রোগের সুপ্তিকাল ৪-৫ দিন; তবে তা সর্বনিম্ন ৩ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। আক্রান্ত প্রাণীর দেহের তাপমাত্রা আকষ্মিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তা ১০৫-১০৭ ডিগ্রী ফা. পর্যন্ত হয়ে থাকে। আক্রান্ত প্রাণী ছটফট করে, মাজল শুষ্ক থাকে, দেহ অনুজ্জ্বল দেখায় ও শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি রক্তাভ দেখায়। খাদ্য গ্রহণ একেবারে কমে যায় এবং রোগের মাত্রা বেশি হলে আক্রান্ত ছাগল-ভেড়ার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পানির ন্যায় দুর্গন্ধযুক্ত পাতলা পায়খানা হয় যা আক্রান্ত প্রাণীর দেহের পছনের অংশে লেপ্টে থাকে। কোনো কোনো সময় মল মিউকাসযুক্ত ও রক্তমিশ্রিত হতে পারে। রোগাক্রান্ত প্রাণী মাথা নিচু করে ঝিমায়। প্রথমে আক্রান্ত প্রাণীর নাক ও চোখ থেকে পাতলা পানির ন্যায় পদার্থ বের হয় যা পরে গাঢ় ও হলুদ বর্ণ ধারণ করে। পরবর্তীতে নিঃসৃত পদার্থ শুকিয়ে গিয়ে চোখ ও নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে ও শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট দেখা দেয়। শ্বাস-প্রশ্বাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়। আক্রান্ত  প্রাণীর মুখের ভেতর মাড়ি, চোয়াল ও জিহ্বায় ঘা দেখা দেয়। এছাড়াও যোনিদ্বারসহ যোনিনালীর মধ্যে ও লিঙ্গাগ্র ত্বকে ঘা হতে পারে। মুখের ভেতর নেটিক প্রদাহ হয়ে নিচের ঠোঁট ও মাড়ি এবং রোগের মারাÍকতা বেশি হলে প্যালেট, গাল ও এর প্যাপিলি এবং জিহ্বা আক্রাস্ত  হয়। রোগের মারাত্মক অবস্থায় লিশানস্/ঘা হার্ড প্যালেট ও ফ্যারিংস্ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। চোখের কনজাংকটাইভা প্রায়শ রক্তাভ হয় এবং মেডিয়াল ক্যানথাসে চটা পড়তে পারে। রোগের শেষের দিকে কাশিসহ ব্রংকোনিউমোনিয়া দেখা দেয়।

গর্ভবতী প্রাণীদের গর্ভপাত হতে পারে। ডায়রিয়ার প্রকোপ খুব বেশি হলে শরীর শুকিয়ে যায় ও পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং দেহের তাপমাত্রা নিচে নেমে যেতে থাকে ও মৃত্যু ঘটে। এ অবস্থা সাধারণত ৫-১০ দিনের মধ্যে ঘটে থাকে। বয়স্কদের থেকে ছোট প্রাণীরা বেশি আক্রান্ত হয় ও এদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হারও বেশি হয়। আক্রান্ত  প্রাণীদের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে অন্যান্য রোগ জীবাণু কর্তৃক দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। পশুর মৃতদেহ মারাত্বকভাবে পানিশূন্য থাকে এবং পেছনের অংশসমূহ তরল মল দ্বারা নোংরা হয়ে থাকে। চোখের আশেপাশে ও নাকে নিঃসৃত পদার্থের মামড়ি লেগে থাকে।ওষ্ঠ ফোলা থাকে।

রোগ প্রতিরোধ:  এ রোগ দুইভাবে প্রতিরোধ করা যায়।

১. আক্রান্ত পশুকে জবাই করে, পুড়ে ফেলে অথবা দুরে একটি গভীর গর্ত (প্রায় ৬ ফুট গভীর) খুড়েঁ মৃত ছাগলকে তার উপর ব্লিচিং পাউডার বা চুন দিয়ে পুতে ফেলতে হবে।

২. ভ্যাকসিনের দ্বারা রোগ আক্রমণের আগেই পশুর মধ্যে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা। সময়মতো পূর্ব থেকে ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে ছাগলকে পিপিআর রোগের হাত থেকে রক্ষা করা যায়।

পিপিআর রোগের টিকা একবার প্রয়োগের ফলে সাধারণতঃ ৩ বছর প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। ভ্যাকসিন ০ ডিগ্রী সেঃ বা এর কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতি ছাগলে ১ মিলি. মাত্রায় কাধেঁর চামড়ার নিচে এ টিকা প্রদান করতে হবে। ছাগল গর্ভাবস্থায় থাকলে শেষ তিন সপ্তাহ টিকা প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ছাগলের বাচ্চার বয়স ৪ মাস হলে তাদেরকে অবশ্যই ভ্যাকসিন দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে ২ মাস বয়স হলে ও ভ্যাকসিন প্রদান করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে ৬ মাস পর বুস্টার ডোজ দিতে হবে। পিপিআর এ আক্রান্ত কোন ছাগলকে এবং যে সমস্ত ছাগল আক্রান্ত ছাগলের সংর্স্পশে ছিল তাদেরকে টিকা দেয়া যাবে না। পিপিআর আক্রান্ত এলাকার চারিদিকে সুস্থ ছাগলকে রিং ভ্যাকসিনেশন -এর আওতায় এনে টিকা প্রদান করতে হবে। নতুন ছাগল ক্রয়ের ক্ষেত্রে অন্ততঃ ১৪ দিন পর্যবেক্ষণে রেখে শুধুমাত্র রোগমুক্ত ছাগলকে টিকা প্রদান করতে হবে।

চিকিৎসা ব্যবস্থা: ছাগলে লক্ষণসমূহ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে অসুস্থ ছাগলকে সুস্থ ছাগল থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। পিপিআর ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এর জন্য নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নাই। তবে লক্ষণ অনুযায়ী এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য দীর্ঘ কার্যকর এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে ৩ দিন পর পুনরায় এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া জেন্টামাইসিন ব্যবহার করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। পাতলা পায়খানা হলে প্রচুর পরিমাণে স্যালাইন অথবা হাতে বানানো গুড় ও লবণ মিশ্রিত স্যালাইন খাওয়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সালফার ড্রাগস জাতীয় ট্যাবলেট ৩-৫ দিন খাওয়াতে হবে। এর সাথে মেট্রোনিডাজল জাতীয় ঔষধ ৩-৫ দিন খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়।

পিপিআর রোগের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএলআরআই) একটি সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কার করেছে যা খুবই ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়েছে। বিএলআরআই প্রতিষ্ঠিত এ সমন্বিত চিকিৎসা পদ্বতির নাম এন্টিসিরাম-এন্টিবায়োটিক সমন্বিত চিকিৎসা পদ্বতি। এক্ষেত্রে পিপিআর রোগ থেকে সেরে উঠা বা টিকা প্রদানকৃত ছাগল থেকে (রোগ সারার বা টিকা প্রদানের ২১-২৮ দিন পর) জীবাণুমুক্ত অবস্থায় রক্ত সংগ্রহ করে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা সাধারণ তাপমাত্রায় রাখতে হবে, যাতে রক্ত ভালোভাবে জমাট বাধতে পারে। এরপর খুব সাবধানে জমাট বাঁধা রক্ত থেকে ইমিউন সিরাম পৃথক করে পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত বোতল বা সিরিঞ্জে রাখা যেতে পারে। ইমিউন সিরাম ০ ডিগ্রী বা এর কম তাপমাত্রায় ৭ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এ সিরাম পিপিআর রোগে আক্রান্ত বড় ছাগলে দৈনিক ১০ সিসি এবং বাচ্চা ছাগলে দৈনিক ৩-৫ সিসি করে শিরায় পরপর ৩ দিন প্রয়োগ করতে হবে। এর পাশাপাশি এন্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। এ পদ্ধতিতে ৫০-৯০% আক্রান্ত ছাগল সুস্থ হযে উঠে। ভালো ফল পেতে হলে মানসম্মত সিরাম, সম্ভব হলে সদ্য সংগৃহীত সিরাম ব্যবহার করতে হবে। ঘোলাটে বা অস্বচ্ছ সিরাম কোন অবস্থাতেই ব্যবহার করা যাবে না।

This post has already been read 367 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN