১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০, ৬ শাওয়াল ১৪৪১
শিরোনাম :

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে খোলা আকাশের নিচে খুলনাঞ্চলের অর্ধলাখ মানুষ

Published at মে ২২, ২০২০

ফকির শহিদুল ইসলাম (খুলনা) : প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে খুলনার হাজার হাজার কাঁচা ও সেমিপাকা ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়েছে। খুলনা মহানগরী থেকে শুরু করে কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষের ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে জমির ফসল। আম্পানের কারণে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মোঃ এনামুর রহমা তবে খুলনায় কোনো প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া যায়নি।

এদিকে কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ জাফর রানা বলেন, আম্পানের আঘাতে কয়রার চারটি ইউনিয়নের ৫২টি গ্রাম সম্পূর্ণ এবং আরও দুটি ইউনিয়নের ২৪টি গ্রাম আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপজেলায় সব জায়গারই বেড়িবাধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপকুলীয় এ উপজেলায় ২১টি স্থানে বেড়িবাঁধে ভাঙ্গণ লেগেছে। ৫১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর ফলে ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

দাকোপ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের বলেন, আম্পানের আঘাতে দাকোপ উপজেলায় ১ হাজার ১০০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বটবুনিয়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় দুইটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে। দাকোপে বেড়িবাধের আধা কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ মেরামতে এখনও উদ্যোগ নেয়নি পাউবো ।

তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষ্ণুপদ পাল বলেন, আম্পানের আঘাতে তার উপজেলায় ৩৭০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি ঘর সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

আম্পানের আঘাতে রাতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। বৃহস্পতিবার সকালের জোয়ারে বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের ঘরবাড়ি এখন পানির নিচে। কয়রা উপজেলা সদরও জোয়ারের পানিতে ভাসছে। ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে বুধবার রাত থেকেই কয়রা উপজেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অবস্থান করছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান বাবু। বৃহস্পতিবার সকালে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি জানান, ৬টি স্থানে বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নদীর পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রামের পর গ্রাম লোনা পানিতে ভাসছে। দ্রুত ভাঙা বাঁধ মেরামত করা না গেলে এ লোনা পানিই দীর্ঘস্থায়ী বিপদ ডেকে আনবে। তিনি বলেন, শতশত ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ। হাজার হাজার গাছ ভেঙে গেছে, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতোই বেশি যে, হিসাব বের করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা। এমন ভয়ানক ঝড় অনেকদিন দেখেনি এ জনপদের মানুষ। এদিকে দাকোপ উপজেলার বেড়িবাঁধ রক্ষা পেলেও কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ উপকূলীয় উপজেলা দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় খুলনা জেলা প্রশাসন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে।

খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ার্দ্দার জানান, আম্পানের আঘাতে খুলনার ৯টি উপজেলার ৮৩ হাজার ৫৬০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিতে পড়েছেন সাড়ে ৪ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে কয়রা উপজেলায়, সেখানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।
খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ড. মুঃ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বৃহস্পতিবার সারাদিন দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্থ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। ত্রাণ সমগ্রীর মধ্যে ছিলো ঢেউ টিন, শুকনা খাবার, সুপেয় পানি ও নগদ অর্থ। ত্রাণ বিতরণকালে বিভাগীয় কমিশনার বিভাগীয় কমিশনার ড. মুঃ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের বিষয়টি তদারকি করছেন। তাঁর নির্দেশে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের কাজ শুরু করেছে। যাতে সকল ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ সরকারি সহায়তা পান।

খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন জানান, খুলনায় উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪২ হাজার কাঁচা ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং ৩৬ হাজার কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্থ হয়েছে। দুই একদিনের মধ্যে স্থানীয় জন প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক এবং চিৎড়ি ও মাছ চাষীদের তালিকা তৈরি করার কাজ শুরু হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় বেড়িবাধগুলো টেকসইভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং শীঘ্রই তা একনেকে উঠবে। ত্রাণ বিতরণকালে জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস, বটিয়াঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আশরাফুল আলম খান, দাকোপ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনসুর আলী খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জিয়াউর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সারােয়ার আহেমদ সালেহীন, উপজেলা নির্বাহ অফিসার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বনবিভাগের একটি সুত্র জানায়,আম্পানের তান্ডবের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বনবিভাগের ৬০টির অধিক পুকুরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করেছে। সুন্দরবনের গাছ গাছালির মধ্যে কেওড়া গাছ বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সুন্দরবনের ক্ষতিগ্রস্থ বা ভেঙে যাওয়া গাছপালা অপসারণ করা হবে না জানিয়ে পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন নিজস্ব প্রাকৃতিক ক্ষমতা বলেই এটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। শুধু ক্ষতিগ্রস্থ অবকাঠামোগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। পুকুরগুলোর লবণাক্ত পানি অপসারণ করে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কিছু পুকুর পুনঃখননের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বুধবার (২০ মে) সন্ধ্যারাত থেকে শুরু হয় অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তান্ডব। সারারাত এটি দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তান্ডব চালিয়েছে। সারারাত তান্ডব চালানোর পর সকাল সাড়ে ৭টার পর এটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। এরপর স্থল নিম্নচাপ হিসেবে রাজশাহীতে অবস্থান করছিল আম্ফান। সকালেই মোংলা সমুদ্রবন্দরে মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলে আবহাওয়া অধিদফতর।

This post has already been read 258 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN