৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১৮ জিলহজ্জ ১৪৪০
শিরোনাম :

গাঁদাফুলের চাষাবাদ

Published at ডিসেম্বর ২২, ২০১৮

মৃত্যুঞ্জয় রায় : গাঁদাফুলকে কে না চেনে? শীতের সময় হলুদ বাসন্তী-কমলা রঙের প্রচুর ফুল ফুটে গাছ আলো করে ফেলে। অন্য মৌসুমেও ফোটে। তবে গাছ বেঁচে থাকে সারা বছর। এ ফুল এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। যারা জানেন, তাদের কাছে গাঁদা ফুলের কদরটা অন্য রকম। কেননা, হঠাৎ কোথাও কেটে গেলে সে স্থানের রক্তপড়া বন্ধ করতে গাঁদা ফুলগাছের পাতা অব্যর্থভাবে কাজ করে। পাতার রসে জীবাণুবিনাশী গুণ থাকায় কাটা স্থানে তা লাগালে সেখানে জীবাণুর সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে না। অল্প কাটা হলে সে কাটা দ্রুত পাতার রসের গুণে জোড়া লেগে যায়। তাই প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাতের কাছে অন্তত একটা গাঁদা ফুলের গাছ রাখা উচিত। গাঁদাফুলের ইংরেজী নাম Marigold. গাঁদার উৎপত্তি স্থল মেক্সিকোর গেন্ডামারিতে। এর রঙ সোনার মতো। সোনার ইংরেজী গোল্ড, আর গেন্ডামেরির মেরী- এই দুটি শব্দ মিলে এর ইংরেজী নাম হয়েছে মেরীগোল্ড।

জলবায়ু মাটি

গাঁদা ফুলের জন্য মৃদু ঠাণ্ডা  আবহাওয়া ভালো। সাধারণত ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় ও বেশি ফুল ফোটে। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরে গেলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও ফুল ফোটা কমে যায়। তীব্র ঠাণ্ডাতেও গাছের সমস্যা হয়। মাটির অম্লমান বা পিএইচ ৫.৬ থেকে ৬.৫ গাঁদা ফুল চাষের জন্য ভালো। কোনো স্থানে গাঁদা আগাছা, প্রচুর বাড়-বাড়তি। যে কোনো মাটিতে এ গাছ জন্মে। তবে সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটিতে ভালো জন্মে। জলাবদ্ধতা সইতে পারে না, তবে কিছুটা খরা সইতে পারে এমন জাত আছে।

চাষাবাদ

গাঁদা ফুল চাষের জন্য রোদযুক্ত খোলা জমি চাই। টবেও লাগানো যেতে পারে। সাধারণত বর্ষাকালে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বীজ বুনে গাঁদা ফুলের চারা তৈরি করা হয়। বীজতলা বা বেড, গামলা টব, পলিব্যাগ, প্লাস্টিকের কাপ, ট্রে ইত্যাদিতে এর চারা উৎপাদন করা যায়। মাটির সাথে গোবর সার মিশিয়ে ভালোভাবে বীজতলা তৈরি করে সেসব বীজতলা বা বেডে ২ সেন্টিমিটার পর পর একটা করে বীজ সারিতে বোনা হয়। গাঁদা ফুলের পাকা বীজের রঙ কালো। বীজ ১-২ বছর সজীব থাকে। বীজ গজানোর জন্য বেড আর্দ্র রাখা উচিত। বীজ বোনার পর ৫-৭ দিনের মধ্যেই তা গজায়। বীজ বোনার আগে ছত্রাকনাশক পাউডার (যেমন ব্যাভিস্টিন বা প্রোভ্যাক্স) দিয়ে শোধন করে নিলে গজানো চারায় চারা ধসা বা গোড়া পচা রোগের সংক্রমণের ভয় থাকে না। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে হেক্টরে প্রায় ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি বীজ লাগে। প্রতি হেক্টরের জন্য হাইব্রিড জাতের বীজ লাগে মাত্র ২৫০ গ্রাম। জমি চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ১৫-২৯ টন গোবর সার মিশিয়ে চাষ দিলে ভালো হয়। চারার বয়স মাস খানেক হলে মূল জমিতে সারি করে লাগানো হয়। বছরে ৩ মৌসুমে গাঁদা ফুলের চাষ করা যায়- বর্ষা, শীত ও গ্রীষ্ম। প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে। তবে শীতকালে চাষ ভালো হয়। শীতকালে চাষের জন্য সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চারা লাগাতে হবে। নভেম্বর মাস থেকে সেসব গাছে ফুল আসে। শীতের শেষে বীজ পাকে। বর্ষা মৌসুমে বীজ বুনতে হয় জুনের মাঝামাঝি, চারা রোপণ মধ্য জুলাইতে। শীত মৌসুমে বীজ বুনতে হয় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি, চারা রোপণ করতে হয় অক্টোবরের মাঝামাঝি। গ্রীষ্মকালে চাষের জন্য বীজ বুনতে হয় জানুয়ারি-ফেব্রæয়ারিতে, চারা লাগাতে হয় ফেব্রæয়ারি-মার্চে। এখন সারা বছরই গাঁদা ফুলের চাষ হচ্ছে। চারায় ৩-৫ পাতা হলে তা রোপণের উপযুক্ত হয়। লিকলিকে ও লম্বা চারা না লাগানো ভালো। আবার বেশি বয়সের চারাও না লাগানো উচিত।

প্রায় ১৫-২০ সেন্টিমিটার লম্বা করে বয়স্ক ডাল তেড়ছা করে কেটে মাটিতে পুঁতে দিলে তা থেকেও গাছ হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৩০-৪০ সেন্টিমিটার ও প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার পর পর চারা লাগাতে হবে। আফ্রিকান গাঁদার বেলায় সবদিকে ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব দিয়ে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগানোর পর সেচ দিতে হবে। ভালো বাড় বাড়তির জন্য সার দেয়া দরকার। জমিতে ১০০:৭৫:৭৫ অনুপাতে নাইট্রোজেন, পটাশ ও ফসফেটঘটিত সার দিতে হবে। গাঁদা ফুলের আকার বড় ও রঙ ভালো করার জন্য বোরণ ও জিংক সার দিতে হবে। নাইট্রোজেনঘটিত ইউরিয়া সারের অর্ধেক ও অন্য সব সার জমি তৈরির সময় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া চারা রোপণের ৩০-৪০দিন পর সারির মাঝে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে সেচ দিতে হবে। জমিতে কোনো আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবে না। গাছ ঝোপালো ও বেশি ফুল পাওয়ার জন্য প্রথম কুঁড়িগুলো চিমটি দিয়ে ফেলে দিতে হবে। চারা লাগানোর সাধারণত ৪০ দিন পর এ কাজ করতে হয়। বেশকিছু রোগ গাঁদা ফুলগাছকে আক্রমণ করে যেমন- গোড়া পচা, কলার রট, ঢলে পড়া, পাতায় দাগ, পাতা ঝলসা, ফুল পচা, পাউডারি মিলডিউ, মোজাইক ইত্যাদি রোগ। বিভিন্ন শত্রæ পোকামাকড়ের মধ্যে লাল মাকড় ও জাব পোকা গাঁদা ফুলগাছের বেশি ক্ষতি করে। এসব রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ফুল-পাতা তোলা ফলন

চারা লাগানোর ৪০-৫০ দিন পর থেকেই গাছের ফুল তোলা শুরু করা যায়। জাত ও প্রকারভেদে এ সময় কম-বেশি হতে পারে। সকালে ফুল তুলতে হয়। পাতা ব্যবহার করতে চাইলে যেকোনো সময় তা তোলা যায়। ফুল তোলার আগে জমিতে একবার সেচ দিলে তাতে ফুলের মান ভালো হয়। ফুল ফোটা প্রায় ৩ মাস ধরে চলতে থাকে। এ সময়ের মধ্যে একটি গাছ থেকে প্রায় ১০০-১৫০ টি ফুল পাওয়া যায়। হেক্টরপ্রতি আফ্রিকান গাঁদা ফুলের ফলন ১৫-২৮ টন ও ফ্রেঞ্চ গাঁদা ফুলের ফলন ১০-১২ টন।

লেখক: প্রকল্প পরিচালক, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোনেন্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা।

This post has already been read 294 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN