৩০ কার্তিক ১৪২৬, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১৬ রবিউল-আউয়াল ১৪৪১
শিরোনাম :

এবার মাছ ও সবজি থেকে কেক তৈরি

Published at জুলাই ৭, ২০১৯

মো. আরিফুল ইসলাম (বাকৃবি): আজকের সুস্থ-সবল ও বুদ্ধিদীপ্ত শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আর ভবিষ্যৎ কর্ণধার এই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য চাই পুষ্টিকর খাবার। শিশুদের খাবার দাবার নিয়ে বাবা মা সব সময় বেশ উদ্বিগ্ন থাকেন। বর্তমানে বাচ্চারা সবজি ও মাছ একদমই খেতে চায় না। কিন্তু শিশু, কিশোর-কিশোরী ও চাকরিজীবী পরিবারের মায়েরা ধোয়া-বাছা ও কাঁটার ভয়ে যতোটা সম্ভব মাছ ও সবজি এড়িয়ে চলেন। তারা জানেন না, সবজি ও মাছ শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থতার জন্য কতোটা জরুরি। সবজি ও মাছ থেকেই আমরা শরীরের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনেক ভিটামিন, মিনারেলস, আমিষ, চর্বি ও ফাইবার পেয়ে থাকি।

তাছাড়া, সবজি ও মাছ অন্যান্য খাবার হজমে সাহায্য করে, ক্ষুধা মন্দা দূর করে, লালাগ্রন্থির কার্যকারিতা বাড়ায়, গ্যাস্ট্রিক জুস নিয়ন্ত্রণ রাখে এবং শারীরবৃত্তীয় সকল ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিন্তু বাচ্চাদের সবজি ও মাছ খাওয়ানো এতো সহজ নয়। বাচ্চারা টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে চা, কফি, সফট ড্রিংস, চিপস, চকলেটসহ বিভিন্ন প্রকার ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এমনি এক মজাদার ও পুষ্টিকর খাবার ফাস্ট ফুডের আদলে পুষ্টিকর মাছ ও সবজির কেক উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের প্রফেসর ড. এম এ সালাম। রবিবার (৭ জুলাই) দু’দিনব্যাপী “তৃতীয় একোয়াপনিক্স প্রশিক্ষণ ও জাতীয় কর্মশালা’র সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. লুৎফুল হাসানের হাত দিয়ে মাছ ও সবজির কেক কেটে নিজের উদ্ভাবনের উদ্বোধন করান। ড. সালাম বলেন, ব্যস্ততাও সংসারের নানামুখি চাপের কারণে অনেক মা-ই বাসায় শিশুদের জন্যস্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করে খাওয়াতে সময় পান না।

তাছাড়া, অনেক পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যকর খাবার সম্বন্ধে তেমন স্বচ্ছ জ্ঞান না থাকায় বয়স্করা ও শিশুদের সামনে ফাস্ট ফুড খেয়ে থাকেন। ফলে অনুকরণ প্রিয় শিশুরা ফাস্ট ফুড খেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এতে করে শিশুরা দিন দিন আরো বেশী ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত হচ্ছে এবং মায়েরাও নিশ্চিন্ত থাকেন তার শিশু কিছু একটা খাচ্ছে দেখে। ফাস্ট ফুডে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্ষতিকর স্যাচুরেটেট ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত লবণ, চিনি, রং ও খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য মনোগ্লুটামেট লবণ থাকে, যা মানবদেহে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। ফাস্টফুড খেতে উপাদেয় বা মুখরোচক হলেও এসব খাদ্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত ও পরিবেশিত হয় বলে বিভিন্ন প্রকার জটিল ও মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। স্কুল পড়ুয়া ছোট ছোট শিশুরা এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার বেশী খায় বলে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় মা-বাবারাও তাঁদের সন্তানদের এসব খাবার কিনে দেন এবং খেতে উৎসাহিত করেন। ফাস্ট ফুডের যতই ক্ষতিকর দিক থাকনা কেন ব্যস্ততম নাগরিক জীবনে আমাদের একে অগ্রাহ্য করার কোন উপায় নেই।

তাছাড়া, পাড়া-মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মত ফাস্ট ফুডের দোকান গড়ে উঠছে দিন দিন যা আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাইকে আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ২০১৮ সালে দেশে ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে যা দেশের চাহিদার তুলনায় বেশী। কিন্তু মাছ রান্না করা ঝামেলাপূর্ণ ও কাটাযুক্ত হওয়ায় শিশু, কিশোর ও বৃদ্ধদের পক্ষে কাঁটা বেছে মাছ খাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে মাছ যতোই পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও শরীরের জন্য প্রয়োজনী হোক না কেন ছোট পরিবারের পক্ষে মাছ খাওয়া হয়ে ওঠে না। বিশ্ব বাজারে আমাদের দেশীয় মাছ রপ্তানি করতে না পারায় চাষিগণ মাছের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না। মাছ চাষে তারা উৎসাহ হারিয়ে অন্যান্য ফসলের চাষ করছেন বা মাছ চাষের খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এই সকল সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য তিনি এ মাছের কেক উদ্ভাবন করেছেন যা শিশু, কিশোর ও আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবার যেমন পছন্দ হবে তেমনি পুষ্টি সমস্যারও সমাধান হবে।

এই কেক যেমন বাসায় তৈরি করা যাবে তেমনি ফাস্ট ফুডের দোকানেও জনপ্রিয়তা পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এই কেকের মধ্যে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যা যা থাকা উচিৎ যেমন শাক-সবজি, মাছ, ডিম, মাশরুম, স্প্রাউট, ক্যাপসিকাম, পনিরসহ বিভিন্ন মসল্লা ও রয়েছে। তাই এই কেক শিশু, কিশোরসহ মূখ্য খাবার হিসাবেও ব্যবহার করা যাবে। এই পুষ্টিগুণ সম্পর্কে তিনি বলেন, মাছের কেক তৈরীর পর একোয়াকালচার বিভাগের ফিস নিউট্রিসন গবেষনাগারে এর গুণগতমান পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম মাছের কেক আমিষ রয়েছে ৪৮.৮৬ গ্রাম, স্নেহ/তেল ২৮.৪২ গ্রাম, শকর্রা ২.৪ গ্রাম, অ্যাশ বা ছাই ৬.৩৭ গ্রাম, ক্রড ফাইবার ৩.৬২, পানি ১০.৩৩ গ্রাম এবং শক্তি রয়েছে ৫৩৭.২ কিলো ক্যালরি। একটি মাছের কেকের মোট ওজন ছিলো ৭৯২ গ্রাম যাকে ৬ টুকরা করা হয়েছিল। যার এক টুকরার ওজন ছিলো ১৩২গ্রাম যাতে মোট শক্তি ছিলো ২১৪.৬৭ কিলো ক্যালরি যা একটি শিশু বা একজন বৃদ্ধের এক কালীন নাস্তার জন্য যথেষ্ট।  ড. এম এ সালাম গত ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশে একোয়াপনিক্স ও হাইড্রোপনিক্স নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম একোয়াপনিক্স ও হাইড্রোপনিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটি ছাড়া মাছ ও বিষমুক্ত সবজি চাষের বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন।

This post has already been read 94 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN