২৬ চৈত্র ১৪২৬, ৮ এপ্রিল ২০২০, ১৫ শাবান ১৪৪১
শিরোনাম :

আধুনিক পদ্ধতিতে পটল চাষ ও ব্যবস্থাপনা

Published at মার্চ ৩, ২০২০

মো. এমদাদুল হক : গ্রীষ্মকালীন সব ধরনের সবজিগুলোর মধ্যে পটল অন্যতম। পটলের অন্যতম বৈশিষ্ঠ হলো এর অধিক পুষ্টিমান আর দীর্ঘদিন পর্যন্ত পাওয়া যায়। পটল বিভিন্ন ভাবে রান্না করে খাওয়া হয়। এটি হজমেও বেশ সহায়ক। তাছাড়া এফসলটি দীর্ঘদিন মাঠে থাকার কারণে এর যত্ন ওপরিচর্যা দীর্ঘ সময় ধরেই করা প্রয়োজন। পটলের পুষ্টিমান, উচ্চমূল্য, বহু ধরনের ব্যবহারের কথা বিবেচনা করলে পটল চাষে আমাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন। পটলের বেশি ফলনের জন্যে যে বিষয়গুলোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে সেগুলো হল- সার ব্যবস্থাপনা, আগাছা দমন, বাউনি/মাচা দেয়া, প্রুনিং বা অঙ্গ ছাঁটাই, মালচিং করা, হাত পরাগায়ন করা, রোগ ও পোকা-মাকড় দমন এগুলোই প্রধান।

পটলের জাত: বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে পটলের বিভিন্ন জাত দেখা যায়। যেমন লম্বা ও চিকন, খাটো ও মোটা, গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ,ডোরা কাটা ও ডোরা কাটা বিহীন, পুরুত্বক থেকে হালকা ত্বক। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পটলের দুটি জাত উদ্ভাবোন করেছে। জাত দুটো উচ্চ ফলনশীল ও রোগবালাই সহ্য করতে পারে সেগুলো হলো ‘বারি পটল-১’ ও ‘বারি পটল-২’। আর পটল চাষের জন্য যে মাটিতে পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি এবং বেলে দো-আঁশ থেকে দো-আঁশ মাটি পটল চাষের জন্য উপযোগী। পটল বেশ খরা সহিষ্ণু। তবে পানির ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ফলন কমে যায়।

রোপণ সময় : অক্টোবর থেকে  নভেম্বর অথবা ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস পটল রোপণের উপযুক্ত সময়। পটল আগাম চাষ করলে অক্টোবর মাসে জমি তৈরি করতে হবে। রোপনের পর মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে শাখা কলম শুকিয়ে মারা যায়। এ ক্ষেত্রে পলিব্যাগে চারা গজিয়ে জমিতে রোপণ করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এতে তীব্র শীত পড়ার আগেই গাছের অঙ্গজ বৃদ্ধি হয়। আগাম ফলন পাওয়া যায় এবং যার বাজার মূল্য তুলনামূলক অনেক বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া ভাল যত্ন করলে ডিসেম্বর মাসেও পটল পাওয়া  সম্ভব। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পলিব্যাগে চারা তৈরি করে অবশ্যই আগস্ট মাসে তা জমিতে রোপণ করতে হবে। অন্য দিকে খরিপ মৌসুমের জন্য যেগুলো ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে রোপণ করা হয় সেটা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এদের ফলন তুলনামূলক বেশি হয়। বেড পদ্ধতিতে পটল চাষ করলে ফলন ভালো হয় এবং বর্ষাকালে ক্ষেত নষ্ট হয় না। সাধারণত একটি বেড ১.০-১.৫ মিটার চওড়া হয়। বেডের মাঝামাঝি এক মিটার থেকে দেড় মিটার বা দু’হাত থেকে তিন হাত পর পর মাদায় চারা রোপণ করতে হয়। এক বেড থেকে আর এক বেডের মাঝে ৭৫ সেমি. নালা রাখতে হবে। চারা বা  মোথা  রোপণের সময় ১০টি স্ত্রী গাছের জন্য ১টি পুরুষ গাছ সুষ্ঠু পরাগায়নের জন্য রোপণ করতে হবে এবং পরুষ গাছগুলো ছড়িয়ে লাগাতে হবে।

সার ব্যবস্থাপনা : পটলের ভাল ফলন পাওয়ার জন্য মাঝারী উর্বর জমিতে বিঘাপ্রতি ১৩০০ কেজি গোবর বা কম্পোষ্ট, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ২৭ কেজি টিএসপি, ২০ কেজি এমওপি এবং ৮ কেজি জিপসাম ব্যবহার করা প্রয়োজন। ইউরিয়া ছাড়া সব সারের অর্ধেক পরিমাণ জমি তৈরির সময় এবং বাকী অর্ধেক সার মাদায় দিতে হবে। ইউরিয়া সার চারা গজানোর ২০ দিন পর পর সমান ৩ কিস্তিতে মাদার চারপাশে প্রয়োগ করতে হবে। আমরা জানি পটলের ফলন প্রথম দিকে বেশি হয় এবং গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফলনও কমতে থাকে। এ জন্য ফসল সংগ্রহের পর প্রতি মাসে,ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করে গাছের চারপাশে ২০-৩০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০- ৩৫ গ্রাম টিএসপি ও ২০-৩০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করলে গাছে নতুন কুশি ও ফুল আসবে।

প্রুনিং বা অংগ ছাঁটাই: বেশি ফলনের জন্যে অংগ ছাঁটাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পটল গাছ মাচায় উঠার আগ পর্যন্ত সব পার্শ্ব  শাখা ছাঁটাই করতে হবে। এবং গাছের গোড়া শুকিয়ে না যায় সেজন্যে গাছের গোড়ায় জাবড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এতে করে গাছের মাটিতে রস ধরে রাখার ক্ষমতা অনেকটা বেড়ে যায়।

পটল গাছ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জমিতে মাচা তৈরি করে ইহার গোড়ায় বাঁশের কঞ্চি বা কাঠি পুঁতে মাচায় তুলে দিতে হবে। এক মিটার উচ্চতায় মাচা বা বাউনি দিতে হবে। পটলের মাচা বা বাউনি দুই ভাবে দেয়া যায়। বাঁশের তৈরি বা রশি দ্বারা তৈরি করে। মাচার দৈর্ঘ ও প্রস্থ হবে বেডের সমান। পটলের মাচা বা বাউনি বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাই অনেক এলাকায় পটল চাষীরা বাউনির বদলে মাটির উপর খর-কুটা বা কচুরিপানা দিয়ে তার উপর গাছ তুলে দেয়। এতে উৎপাদন খরচও কম হয়। আর ফসল সংগ্রহের পর মরা, রোগ ও পোকমাকড় আক্রান্ত পাতা ও শাখা ছাঁটাই করতে হবে। এতে ফলধারী নতুন শাখার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং ফলন বেশি হয়।

পরাগায়ণ: পটলে পরপরাগায়ণ সাধারনত: বাতাস বা কীট পতঙ্গের মাধ্যমে হয়ে থাকে। পরাগায়ণ ঠিকমত না হলে স্ত্রী ফুল শুকিয়ে যায়। এতে ফল ধরেনা। তাই পর প্রয়োজনে হাত পরাগায়ন করতে হবে।

মুড়ি ফসল হিসাবে পটল: পটল মুড়ি ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। উঁচু জমিতে পটলের মুড়ি ফসল করা হয়। এ ক্ষেত্রে অক্টোবর মাসে পটলের জমির আগাছা ও শুষ্ক পুরনো লতা ছেটে দেয়া হয়। কোঁদাল দিয়ে জমি কুপিয়ে দিতে হয়। মুড়ি ফসলে মূল ফসলের অনুরূপ সার প্রয়োগ ও অন্যান্য পরিচর্যা করতে হয়। মুড়িফসলে মূল ফসলের চেয়ে বেশি ফলন হয়। পটল গাছে প্রথম বছর কম ফলন হয়। দ্বিতীয় বছর ফলন বেশি হয়, তৃতীয় বছর ফলন কমতে থাকে। একবার লাগানো গাছ তিন বছরের বেশি রাখা উচিত নয়।

ফসল সংগ্রহ : কচি অবস্থায় সকাল অথবা বিকালে পটল সংগ্রহ করতে হবে। সাধারণত ফুল ফোটার ১০-১২ দিনের মধ্যে পটল সংগ্রহের উপযোগী হয়। ফসল এমন পর্যায়ে সংগ্রহ করা উচিত যখন একটি ফল পূর্ণ আকার প্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু বেশি পরিপক্ব হয়নি। বেশি পরিপক্ব ফলের বীজ বেশি হয় এবং বীজ শক্ত হয়ে যায় ফলে ফসল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।

লেখক : এআইসিও, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী।

This post has already been read 1288 times!

Fixing WordPress Problems developed by BN WEB DESIGN